তিন শব্দ ঘিরে কোটি টাকা ‘বাণিজ্যের’ অভিযোগ
- সর্বশেষ আপডেট ০২:২২:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
- / 29
‘দাপ্তরিক প্রয়োজনে বদলি’- এই তিন শব্দ এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং ব্যাপক দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থাটিতে গণহারে বদলি, পদায়ন এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যেরও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম।
গত ২৮ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রিজার্ভ) পদে সংযুক্ত করা হয়। একই আদেশে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ( মেট্টো জোন) খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দপ্তর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গ্রেডেশন তালিকায় একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, এটি শুধু জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনই নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর বড় আঘাত।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে শুরু হয় ব্যাপক বদলি কার্যক্রম। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং সহকারী প্রকৌশলী পর্যায়ের শতাধিক কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়।
বিশেষ করে ৪, ১৭ এবং ১৮ নভেম্বর জারি হওয়া পৃথক আদেশে ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল, নওগাঁ, গাজীপুর, ভোলা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও জেলায় বড় ধরনের পদায়ন করা হয়।
অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এসব বদলির পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজনের চেয়ে আর্থিক লেনদেনই ছিল মূল চালিকাশক্তি।
একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ৬৫ জন কর্মকর্তার একটি তালিকা ঘিরে প্রতি বদলির বিপরীতে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী এবং তার ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক বলয়।
গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ বা ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচিত বিভাগগুলোতে পদায়নের জন্য মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
প্রাইজ পোস্টিং বিতর্কে যেসব নির্বাহী প্রকৌশলীর নাম ঘুরে ফিরছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- সৈয়দ ইসকান্দার আলী, জুবায়ের বিন হায়দার, নাজমুল আলম রববানী, শরিফুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, তরিকুল আলম, রুবাইয়াত ইসলাম, আজমুল হক, মিজানুর রহমান, জাহিদুল ইসলাম খান, এ কে এম তানভীর আহমেদ ও ফতেহ আজম খান।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলীদের বড় অংশকেই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বহাল রাখা হয়েছে, অন্যদিকে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে থাকা কর্মকর্তাদের ঘনঘন বদলির মাধ্যমে প্রশাসনিক ভারসাম্য পুনর্গঠন করা হয়েছে।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অতীতেও নানা অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে পিএইচডি ডিগ্রি সংক্রান্ত বিতর্ক, উচ্চতর শিক্ষাছুটির অনিয়ম, বিদেশে দীর্ঘ অবস্থান এবং প্রশাসনিক শাস্তির রেকর্ড।
দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একসময় তার বিরুদ্ধে লঘুদণ্ড হিসেবে বেতন স্কেল এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তিনি পদোন্নতি পান।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট গ্রিন সিটি প্রকল্পেও তার দায়িত্বকাল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পাবনায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তার চাকরিজীবনের বড় একটি সময় বিদেশে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় কাটানো এবং পরিবারের স্থায়ী অবস্থান নিয়েও দপ্তরে দীর্ঘদিন প্রশ্ন ছিল।
অভিযোগ আরও রয়েছে, সাবেক পূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারসহ প্রভাবশালী প্রশাসনিক মহলের সমর্থন ও তদবিরে তার ক্যারিয়ার অস্বাভাবিকভাবে এগিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন ও ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও তিনি সাড়া দেননি।





































