৩২০ জীবনরক্ষার গল্প, নতুন অঙ্গীকার
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:০৬:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 38
প্রতিটি হৃদ্স্পন্দনের পেছনে একটি জীবন আছে। সেই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, ভালোবাসা, দায়িত্ব, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। তাই ৩২০ সংখ্যাটি হয়তো কাগজে-কলমে একটি পরিসংখ্যান; কিন্তু একজন চিকিৎসকের কাছে এর প্রতিটি সংখ্যা একটি করে মানুষের মুখ, একটি পরিবারের উৎকণ্ঠা এবং জীবন ফিরে পাওয়ার গল্প।
আলহামদুলিল্লাহ।
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সেন্টারে ৩২০টি সফল প্রাইমারি পারকিউটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন বা প্রাইমারি পিসিআই সম্পন্ন হওয়ার মাইলফলক আমার কাছে শুধু চিকিৎসাগত সাফল্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ববোধ, পরিবারের ত্যাগ এবং রোগীর প্রতি আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা।
ক্যাথল্যাবের দরজার বাইরে উৎকণ্ঠিত স্বজনদের অপেক্ষা, প্রিয় মানুষটিকে হারানোর আশঙ্কায় অসহায় চোখে চিকিৎসকদের দিকে তাকিয়ে থাকা; এসব দৃশ্য আমাদের প্রতিটি জরুরি চিকিৎসার গভীরতা নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে।
একটি স্বপ্ন থেকে যাত্রা
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫। পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউ ও ক্যাথল্যাবের যাত্রা শুরু হয় একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে; তীব্র হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত, আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া।
আমরা জানতাম, এই পথ সহজ হবে না। হার্ট অ্যাটাক কোনো নির্দিষ্ট সময় মেনে আসে না। গভীর রাত, ভোর, ছুটির দিন কিংবা উৎসব; যেকোনো সময় জরুরি ফোন আসতে পারে।
শুধু আধুনিক ক্যাথল্যাব থাকলেই জরুরি হৃদ্রোগ চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনোলজিস্ট, কার্যকর সিসিইউ, প্রস্তুত জরুরি বিভাগ এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে দ্রুত সমন্বয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি নিবেদিতপ্রাণ দল, যারা দিন-রাত যেকোনো সময় রোগীর পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকবে।
এক বছরের পথচলায় সেই অঙ্গীকারই আমাদের প্রতিদিনের কাজের অংশ হয়ে উঠেছে।
রাত তিনটার ফোন, অপেক্ষায় একটি পরিবার
রাত দুইটা বা তিনটা। হঠাৎ জরুরি বিভাগ থেকে ফোন; একজন রোগী তীব্র হার্ট অ্যাটাক নিয়ে এসেছেন, দ্রুত প্রাইমারি পিসিআই প্রয়োজন।
কখনো ভোরের আগে অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছেছে। কখনো ইফতারের ঠিক আগে হাসপাতালের উদ্দেশে বের হতে হয়েছে। কখনো তারাবির সময়, কখনো সেহরির মুহূর্তে, আবার কখনো ঈদের দিনের পারিবারিক আয়োজন ছেড়ে ছুটতে হয়েছে ক্যাথল্যাবে।
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরেও ফজরের আজানের আগেই পুরো টিমকে প্রস্তুত হতে হয়েছে।
কখনো পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার অসমাপ্ত থেকেছে। কখনো কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে থাকা সম্ভব হয়নি। কখনো সন্তানের অভিমানী প্রশ্ন এসেছে; ‘আবার হাসপাতালে যাচ্ছ?’
এই ছোট্ট প্রশ্নের মধ্যে থাকে ভালোবাসা ও অভিমান। কিন্তু ঘরের সেই অপেক্ষার বিপরীতে হাসপাতালের অন্য প্রান্তে তখন আরেকটি পরিবার প্রিয়জনের জীবনের জন্য অপেক্ষা করে।
একজন চিকিৎসক হিসেবে সেই মুহূর্তে দায়িত্বের গভীরতা আরও বেশি অনুভূত হয়। নিজের পরিবারের অপেক্ষা এবং রোগীর পরিবারের উৎকণ্ঠার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পেশাগত দায়িত্বকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়।
এই ত্যাগের সব সময় দৃশ্যমান স্বীকৃতি থাকে না। কিন্তু একজন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে সেই দীর্ঘ রাতের ক্লান্তি অনেকটাই দূর হয়ে যায়।
‘Time is Muscle’ প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ
হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো ‘Time is Muscle’। অর্থাৎ চিকিৎসা শুরু হতে যত বেশি সময় লাগে, হৃদ্পেশির ক্ষতির ঝুঁকি তত বাড়ে।
বিশেষ করে এসটি-এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা STEMI-এর ক্ষেত্রে করোনারি ধমনি হঠাৎ বন্ধ হয়ে হৃদ্পেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। দ্রুত রক্তপ্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাইমারি পিসিআইয়ের মাধ্যমে ক্যাথেটার, গাইডওয়্যার, বেলুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্টেন্ট ব্যবহার করে বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনারি ধমনিতে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।
তবে এই চিকিৎসা কোনো একক চিকিৎসকের কাজ নয়। রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সময়মতো ইসিজি, প্রাথমিক চিকিৎসা, ক্যাথল্যাব টিমকে সক্রিয় করা, রোগী স্থানান্তর এবং পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণ; প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাথল্যাবে তাই আবেগের জায়গা খুব সীমিত। সেখানে প্রয়োজন স্থিরতা, অভিজ্ঞতা এবং দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। রোগীর রক্তচাপ, হৃদ্স্পন্দন, কার্ডিয়াক রিদম, হেমোডাইনামিক অবস্থা এবং এনজিওগ্রামের ফলাফল একসঙ্গে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কখনো রোগী কার্ডিওজেনিক শকে থাকেন, কখনো কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর পুনরুজ্জীবিত অবস্থায় আসেন, আবার কখনো একাধিক করোনারি ধমনিতে জটিল রোগ থাকে। এসব পরিস্থিতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনি খুলে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার মুহূর্তটি আমাদের কাছে শুধু একটি সফল চিকিৎসা প্রক্রিয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি শিশুর বাবাকে ফিরে পাওয়ার আশা, একজন স্ত্রীর স্বামীকে নিয়ে ঘরে ফেরার স্বপ্ন কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবার সন্তানের মুখ আবার দেখার আকাঙ্ক্ষা।
তবে ধমনি খুলে দেওয়ার কাজ শেষ হলেই চিকিৎসা শেষ হয় না। সিসিইউতে পর্যবেক্ষণ, জটিলতা মোকাবিলা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন, ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ফলোআপ রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ ক্যাথল্যাবের দরজা পেরিয়েই চিকিৎসার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
৩২০টি পিসিআই আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে
এই এক বছরে আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি জীবন সম্পর্কেও অনেক কিছু শিখেছি।
শিখেছি, আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সফল প্রয়োগের জন্য দক্ষতা ও বিচক্ষণতা প্রয়োজন। শিখেছি, একজন চিকিৎসক যত অভিজ্ঞই হোন, একটি সুসংগঠিত টিম ছাড়া জটিল হৃদ্রোগের জরুরি চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো; চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সক্ষমতা বাড়ালেও মানুষের জীবন ও মৃত্যুর বাস্তবতা আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়।
সব রোগী একই অবস্থায় হাসপাতালে আসেন না। কারও চিকিৎসায় দেরি হয়, কারও ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের মতো অন্য জটিলতা থাকে, আবার কারও হৃদ্পেশির বড় অংশ ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও সব রোগীর পরিণতি একই রকম হয় না।
সফল চিকিৎসা আমাদের আনন্দ দেয়, আর জটিল অভিজ্ঞতা আমাদের আরও সতর্ক ও দক্ষ হতে শেখায়। প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা থেকে শেখার আছে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। প্রতিটি বিলম্ব ও জটিলতার কারণ বিশ্লেষণ করেই একটি কার্ডিয়াক সেন্টার আরও উন্নত হতে পারে।
এই অর্জন পুরো টিমের
৩২০টি সফল প্রাইমারি পিসিআই কোনো একক চিকিৎসকের অর্জন নয়। এটি চিকিৎসক, নার্স, ক্যাথল্যাব টেকনোলজিস্ট, সিসিইউ টিম, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগ, জরুরি বিভাগের সহকর্মী, কার্ডিয়াক কাস্টমার কেয়ার, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, হাসপাতাল প্রশাসন এবং সহায়ক কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
গভীর রাতে রোগীর রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করা নার্স, জরুরি মুহূর্তে ক্যাথল্যাব প্রস্তুত রাখা টেকনোলজিস্ট, ফোন পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে আসা সহকর্মী কিংবা উদ্বিগ্ন স্বজনকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া কর্মী; সবার অবদান এই অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা আমাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অসমাপ্ত পারিবারিক আয়োজন, উৎসবের দিনে অনুপস্থিতি কিংবা গভীর রাতের জরুরি দায়িত্ব তাঁরা ধৈর্য ও ভালোবাসার সঙ্গে মেনে নিয়েছেন। তাঁদের নীরব সহযোগিতা ছাড়া এমন নিরবচ্ছিন্ন জরুরি হৃদ্রোগ চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
হাসপাতালের নেতৃত্ব ও প্রশাসনের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, যাঁদের সহযোগিতা এই সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চিকিৎসা, আস্থা ও মানবিকতার দায়িত্ব
এই পথচলায় মহান আল্লাহর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অপরিসীম।
আলহামদুলিল্লাহ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার সুযোগ দেয়। কিন্তু চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়েই আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
চিকিৎসকের জ্ঞান ও দক্ষতা আমার কাছে একটি পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা, মানবিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে পালন করতে হয়। আমরা সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। আর সুস্থতা মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত।
আমাদের রোগী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা আরও বেশি। জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত মুহূর্তে তাঁরা আমাদের ওপর আস্থা রাখেন। সেই আস্থার মর্যাদা শুধু একটি চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রোগীর প্রতি আন্তরিক থাকা, প্রতিটি সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীল হওয়া এবং স্বজনদের সঙ্গে সততা ও সহমর্মিতার সম্পর্ক বজায় রাখাও এর অংশ।
কোনো রোগী সুস্থ হয়ে ফলোআপে এসে যখন বলেন, ‘স্যার, আমি এখন ভালো আছি’, তখন দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অসংখ্য ত্যাগ নতুন অর্থ খুঁজে পায়।
একজন রোগীর হাসি, একটি পরিবারের স্বস্তি এবং সুস্থ জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশাই আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে সময়মতো হৃদ্রোগ চিকিৎসা পৌঁছাতে হবে
এই এক বছরের অভিজ্ঞতা শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানের অর্জন নিয়ে ভাবায় না; বাংলাদেশের লাখো হৃদ্রোগীর ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবায়।
দেশে হৃদ্রোগ চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সময়মতো জরুরি করোনারি ইন্টারভেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরে আধুনিক কার্ডিয়াক চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও দূরবর্তী এলাকার অনেক রোগী দ্রুত বিশেষায়িত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।
হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অনেক রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়। কোথাও দ্রুত ইসিজির ব্যবস্থা নেই, কোথাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, আবার কোথাও অ্যাম্বুলেন্স ও রেফারেল ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি সমন্বিত জাতীয় অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোম বা ACS নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে পর্যায়ক্রমে ২৪ ঘণ্টা প্রাইমারি পিসিআই সেবা চালুর পাশাপাশি জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জরুরি বিভাগ, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ও বিশেষায়িত কার্ডিয়াক সেন্টারের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রয়োজন দ্রুত ইসিজি, প্রশিক্ষিত জরুরি চিকিৎসাকর্মী, টেলি-ইসিজি সুবিধা, পূর্বনির্ধারিত রেফারেল প্রটোকল এবং রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ক্যাথল্যাব টিম প্রস্তুত করার ব্যবস্থা।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সক্ষমতাকেও একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের জন্য কার্যকর সহায়তার ব্যবস্থা করাও জরুরি।
আমার স্বপ্ন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক কিংবা সাধারণ মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে কোথায় চিকিৎসা পাবেন, কীভাবে হাসপাতালে যাবেন কিংবা চিকিৎসার খরচ কীভাবে বহন করবেন; এসব অনিশ্চয়তায় যেন মূল্যবান সময় হারিয়ে না ফেলেন।
সময়মতো হৃদ্রোগের জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব।
এক বছরের অর্জন, আগামীর অঙ্গীকার
আজকের এই মাইলফলকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার শিক্ষকদের, যাঁরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান, ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের শৃঙ্খলা এবং রোগীর প্রতি দায়িত্বশীল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁদের শিক্ষা ও আদর্শ প্রতিটি জটিল সিদ্ধান্তে আজও পথ দেখায়।
আমাদের সামনে এখনো অনেক পথ বাকি। প্রয়োজন আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত ক্লিনিক্যাল অডিট, চিকিৎসার সময় কমিয়ে আনা, জটিল রোগীর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং টিমভিত্তিক চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করা।
আমরা চাই, আমাদের প্রতিটি অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের রোগীদের আরও উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার ভিত্তি হয়ে উঠুক।
মহান আল্লাহ যতদিন সুস্থতা, শক্তি ও সামর্থ্য দেবেন, ততদিন হৃদ্রোগে আক্রান্ত মানুষের পাশে থেকে নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করে যাব, ইনশাআল্লাহ।
আবার হয়তো গভীর রাতে ফোন বেজে উঠবে। আবার হয়তো পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার অসমাপ্ত রেখে হাসপাতালে ছুটতে হবে। আবার হয়তো ক্যাথল্যাবের বাইরে একটি পরিবার উদ্বিগ্ন চোখে অপেক্ষা করবে।
আর আমরা, আমাদের পুরো কার্ডিয়াক টিম, সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে চেষ্টা করব সেই পরিবারের প্রিয় মানুষটির জীবন বাঁচাতে।
কারণ প্রতিটি হৃদ্স্পন্দন মূল্যবান।
প্রতিটি রোগীর হাসপাতালের বাইরেও একটি জীবন আছে; আছে পরিবার, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও অপূর্ণ স্বপ্ন। চিকিৎসার জন্য আসা প্রতিটি মানুষ তাই সর্বোচ্চ মনোযোগ, দক্ষতা, সম্মান ও সহমর্মিতা পাওয়ার অধিকারী।
৩২০টি প্রাইমারি পিসিআই কেবল ৩২০টি চিকিৎসাপদ্ধতির হিসাব নয়। এটি ৩২০টি মানুষের জীবনরক্ষার প্রচেষ্টা, অসংখ্য স্বজনের অপেক্ষা, একটি নিবেদিতপ্রাণ দলের নিরলস পরিশ্রম এবং মানুষের পাশে থাকার এক বছরের অঙ্গীকারের স্মারক।
বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ এবং পপুলার ক্যাথল্যাবের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের প্রত্যাশা; আগামী দিনগুলোতে চিকিৎসায় আরও দক্ষতা, আরও মানবিকতা এবং বাংলাদেশের আরও বেশি মানুষের জন্য সময়মতো জীবনরক্ষাকারী হৃদ্রোগ চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত হোক।
HEAL : জ্ঞান, দক্ষতা ও যত্নে সুস্থতার পথে।
HEART : ভালোবাসা, মানবিকতা ও মর্যাদায় হৃদয়ের পাশে।
HOPE : প্রতিটি রোগী, প্রতিটি পরিবার এবং সুস্থ বাংলাদেশের প্রত্যাশায়।
আলহামদুলিল্লাহ।
৩২০টি প্রাইমারি পিসিআই; এক বছরের সেবা, সংগ্রাম, শিক্ষা, কৃতজ্ঞতা ও নতুন আশার গল্প।
লেখক পরিচিতি
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ), এমডি (কার্ডিওলজি)
ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট
বিভাগীয় প্রধান ও চিফ কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজি বিভাগ
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৯।






























