শিশুশ্রম নিরসনে এখনো সংকট রয়ে গেছে
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৪৪:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
- / 22
ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা। এই এলাকায় দুই কক্ষের পোশাক কারখানায় কাজ করছিল কয়েকজন শিশু শ্রমিক । তাদের বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তাদেরই একজন রনি (আসল নাম নয়)। যে বয়সে ওদের লেখাপড়া, খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সে মেশিনে কাপড় সেলাই করছে।
মুখ তুলে কথা বলার ফুসরত তার নেই। কাজ করতে করতেই রনি পরিবারের কথা জানাল। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে মেজ। রনি বলল, ‘আমার বড় ভাইটা, যে আমার থেইকা দুই বছরের বড়, ও পাথরের ডেরিতে পাথর টানাটানির কাজ করে। অনেক খাটনি ওর। আর দুই বোন মাইনসের বাড়িতে কাজ করে। ছোট ভাইটা বাড়িতে থাকে। মা ছুটা কাজ করে। বাবা মোটে টানে। বাবা-মায়ের টাকায় এতগুলা মাইনসের খাওন, বাসা ভাড়া চালানো অনেক কষ্ট হইয়া যায়। তাই আমরা চার ভাইবোনও কাজ করি।’
রনি জানায়, এইখানে তিনবেলা খাওন দেয়। মাস শেষে দুই হাজার টাকা দেয়। ধরতে গেলে পেটে ভাতে কাজ করি। কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা, আগানগর এবং কালীগঞ্জের পোশাক কারখানায় শিশু শ্রমিকদের চিত্র একইরকম।
সরেজমিনে দেখা যায়, কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা, আগানগর এবং কালীগঞ্জে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার ছোট-মাঝারি কারখানা পোশাক কারখানাগুলোতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমিক কাজ করছে। যা দেশের মোট শ্রমিকের প্রায় ৪৬ থেকে ৪৮ শতাংশ। স্থানীয়ভাবে পরিচালিত প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি ছোট-বড় কারখানায় এই শিশুরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করে। এরমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কর্মী। যাদের বয়স ৭ থেকে ১৪ বছর। ৯৫ ভাগ কারখানায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শিশুরা কাজ করে। অভাব, বাবা-মায়ের অসচেতনতা, পরিবারের অবাধ্য হওয়া, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা যাওয়া, বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে অসহায় হয়ে পড়া শিশুরা তাদের লেখাপড়া ও খেলার বয়সে কলকারখানায় যুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিশুরা ৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পায়।
গবেষণায় দেখা যায়, শিশুশ্রম বন্ধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন, সামাজিক সচেতনতা এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং শিশুশ্রমের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে বহু পরিবার এখনো শিশুদের কাজে পাঠাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালে ‘চাইল্ড লেবার: গ্লোবাল এস্টিমেটস ২০২৪, ট্রেন্ডস অ্যান্ড দ্য রোড ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি শতকের শুরুর তুলনায় শিশুশ্রম প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে, কিন্তু বিশ্ব শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রচেষ্টার ফলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও ২০২৪ সালে বিশ্বে ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু এখনো শিশুশ্রমে যুক্ত। যার মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যা তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। অগ্রগতি হলেও সংকট এখনো রয়ে গেছে ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনিসেফ-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত “মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫”-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
শিশুশ্রম নিরসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কিছুটা অগ্রগতি অর্জন হলেও প্রতিবেদনে একটি কঠিন বাস্তবতা উঠে এসেছে, এখনো লাখ লাখ শিশু শিক্ষা, খেলা এবং শুধু শিশু হিসেবে বেড়ে ওঠার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
সংসদে বাজেট উপস্থাপনে ‘শিশুশ্রম বন্ধ করে তাদের জীবন বিকাশের উপযোগী পরিবেশ ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাজেটে নতুন পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক (নুর) বলেছেন, সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ, শিশু শ্রম ও জবরদস্তিমূলক শ্রম বন্ধকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং অন্তভুক্তিমূলক প্রগতি অজনে বদ্ধ পরিকর। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করার লক্ষ্যে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পূর্ববর্তী কর্মপরিকল্পনার (২০২১-২০২৫) পর্যালোচনার ভিত্তিতে, খসড়া প্রণয়ন এবং কর্মশালার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণের কার্যক্রম চলছে ।
তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিশেষ অভিযান, আইন প্রয়োগ জোরদার ও মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তি , উদ্ধারকৃত শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য সমন্বিত কাযক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া শিশুশ্রম নিরসন ও পুনর্বাসনের জন্য শিশুশ্রম নিরসন ও পুনর্বাসন প্রকল্পটি পুনরায় পরিকল্পনা কমিশনে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। একনেক কর্তৃক প্রকল্পটি অনুমোদন হলে বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া যাবে।
শিশুরাই সব এর আহবায়ক
লায়লা খন্দকারের মতে, বাংলাদেশে শিশু শ্রম নিরসনে অনেক প্রকল্প রয়েছে। অনেক টাকাও খরচ হচ্ছে। কিন্তু শিশু শ্রম নিরসনে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। কেনো, আমরা ব্যথ হয়েছি। নতুন কোনো প্রজেক্ট নেওয়ার আগে এই বিষয়টা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা দরকার। এই প্রজেক্ট সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসা দরকার। আমাদের ঘাটতি, সীমাবদ্ধতাগুলো কোথায়! তারপরই নতুন প্রজেক্টে হাত দেওয়া উচিত।
তিনি আরো বলেন, শিশু শ্রম নিরসনে পরিকল্পনা নেওয়া হয়, সেগুলো কাগজে-কলমে থেকে যায়। এভাবে শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পে অনেক অর্থের অপচয় হচ্ছে। আর যাতে অপচয় না হয়, এজন্য জবাবদিহিতা থাকতে হবে। নতুন প্রজেক্ট আনতে হলে কোন ইনভেনশনগুলো কাজ করে, কোনগুলো কাজ করে না। সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটি শিশুদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনতে পারলো কিনা। এটা না হলে কমপরিকল্পনা, প্রকল্পের পর প্রকল্প নেওয়া হবে, কিন্তু শিশু শ্রম নিরসনে কোনো কার্যকরী ভূমিকা থাকবে না।
তিনি জানান, পরিকল্পনা তখনি কাজে লাগবে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যদি আমাদের সচেতনতা থাকে। বাস্তবায়ন করতে যা যা করা দরকার সেটা ইনশিওর করা। কারণ বাস্তবায়নে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে।
লায়লা খন্দকার আরো বলেন, পরিকল্পনার আওতায় অনেক প্রকল্পও দেওয়া হয়েছে। সেগুলো কেনো সফলতার মুখ দেখেনি তা খতিয়ে দেখা দরকার।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে ৪৩টি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে । ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে তাদেরকে সরিয়ে এনে লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অথচ ঢাকা শহরেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা কাজ করছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের ব্যর্থতা কোথায়!
আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা। দারিদ্র, শিক্ষার সুযোগের অভাব, সামাজিক গ্রহণ যোগ্যতা, আইনের প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা । এই চারটি বিষয় মিলে এই অবস্থাটা তৈরি হয়েছে। পরিবার যেন শিশুর রোজগারের উপর নির্ভরশীল না হয় এজন্য তাদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি।




































