পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রকৌশলী ফারহানার মৃত্যু তদন্তে ধোঁয়াশা
- সর্বশেষ আপডেট ১২:২১:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 64
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংস্কারকাজ পরিদর্শনে গিয়ে প্রকৌশলী ফারহানা হকের মৃত্যু এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না, ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, চলমান যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে সুরক্ষিত ছিল কি না কিংবা ফারহানার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ করা হয়েছিল কি না; এসব প্রশ্নের কোনো পূর্ণাঙ্গ লিখিত উত্তর এখনো পরিবারের হাতে পৌঁছেনি।
ফারহানার পরিবার ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ১৯৮৮ ব্যাচের প্রকৌশলীদের প্রশ্ন, একজন পেশাদার প্রকৌশলী কর্মস্থলে গিয়ে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছিলেন, সেটিই যদি স্পষ্ট না হয়, তাহলে এই মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কতটা?
রোববার রাজধানীর বনানীতে বুয়েট গ্র্যাজুয়েট ক্লাবে বুয়েট ব্যাচ-৮৮ স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সংবাদ সম্মেলনে ফারহানার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এসব প্রশ্ন তোলা হয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং তদন্তের লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফারহানা হক আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে স্ট্রাকচার বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। গত ৬ আগস্ট তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বাংলাদেশ কক্সবাজার অবকাঠামো ইউনিটে সিনিয়র ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন তিনি।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাত্র ১৮ দিনের মাথায়, ২৪ আগস্ট উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এ আইওএমের একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংস্কারকাজ পরিদর্শনে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন ফারহানা। পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। দুই বছরের এক ছেলে সন্তান রেখে যান তিনি।
ঘটনার পর তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। পরিবারের দাবি, দুর্ঘটনার কারণ কিংবা তদন্তের ফলাফল তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। বিষয়টি জানতে গত ৩ ও ১২ সেপ্টেম্বর আইওএমের কাছে ই-মেইল করে ঘটনার প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তাব্যবস্থার বিবরণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ জানায় পরিবার।
১৭ সেপ্টেম্বর পরিবারকে দেওয়া আইওএমের জবাবের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের কাজ স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রাপ্য সিসিটিভি ফুটেজ ও রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে দুর্ঘটনার মুহূর্ত ধরা পড়েনি। অন্যদিকে ফারহানার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এনরুট ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তাদের পর্যালোচনা ও তদন্ত এখনো চলছে এবং কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়নি।
এখানেই তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষ মুহূর্তের ফুটেজ না থাকলে ঘটনাস্থলের নিরাপত্তাব্যবস্থা, যন্ত্রপাতির অবস্থা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, কাজের অনুমোদন, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সাইটে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা; সবকিছুর সমন্বিত পর্যালোচনা কতটা হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বুয়েট-৮৮-এর রাসায়নিক ও পেশাগত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়ার বক্তব্যেও উঠে এসেছে এসব প্রশ্ন। তাঁর মতে, পিপিই নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি শেষ রক্ষাকবচ। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে আগে দেখতে হবে, চলমান জেনারেটরের ঘূর্ণায়মান অংশ যথাযথভাবে সুরক্ষিত ছিল কি না এবং সংস্কারকাজের এলাকা নিরাপদভাবে পৃথক করা হয়েছিল কি না।
তার মতে, তদন্তে শুধু ফারহানা কী পরেছিলেন বা কী করেননি, সেটি দেখলে চলবে না। ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি নির্ধারিত ছিল কি না, প্রয়োজনীয় পিপিই সরবরাহ করা হয়েছিল কি না, কাজটি যথাযথভাবে তদারক করা হচ্ছিল কি না এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল কি না; প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী দুর্ঘটনার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
ফারহানার বাবা প্রকৌশলী এ কে ফজলুল হকের প্রশ্ন আরও সরাসরি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের প্রকৃত মৃত্যুর রহস্য আমি বাবা হিসেবে জানতে চাই। একটি কাজের সাইটে নিরাপত্তার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত না থাকলে কেউ কাজে যায় না। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি না, সেটি জানতে চাই।’
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল পরিবারের জানার অধিকার নয়; কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জবাবদিহিতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার অবকাঠামো প্রকল্পে কর্মরত একজন প্রকৌশলীর মৃত্যু হলে সেখানে নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে সংস্কারকাজ চলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিবেশ নিয়েও। বুয়েট-৮৮-এর প্রকৌশলী ফাহীমা সাহাদাত বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের চলাচল থাকলে সংস্কারকাজ ও চলমান যন্ত্রপাতি থেকে তাঁদের এবং কর্মীদের নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, কাজের এলাকা যথাযথভাবে বেষ্টনী দিয়ে আলাদা করা হয়েছিল কি না; এসব বিষয়ও তদন্তে আসা উচিত।
অর্থাৎ তদন্তের পরিধি শুধু দুর্ঘটনার মুহূর্তে কী ঘটেছিল, সেখানে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। দুর্ঘটনার আগে ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়েছিল কি না, দায়িত্ব বণ্টন কী ছিল, সাইটে কে তদারকি করছিল, যন্ত্রপাতি ব্যবহারের নিরাপত্তা মানা হয়েছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য কী প্রস্তুতি ছিল; পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাই খতিয়ে দেখতে হবে।
ফারহানার মৃত্যুর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ঘাটতি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে তথ্যের স্বচ্ছতা। পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার তথ্য চাওয়ার পরও যখন চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে; তদন্ত শেষ হতে এত সময় লাগছে কেন এবং তদন্তে কী কী বিষয় পরীক্ষা করা হচ্ছে?
বুয়েট-৮৮-এর প্রকৌশলীদের দাবি, আইওএম বাংলাদেশ ও এনরুট ইন্টারন্যাশনালকে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে ফারহানার পরিবারকে পূর্ণাঙ্গ লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে যদি কোনো ধরনের নিরাপত্তাগত ঘাটতি, দায়িত্বে অবহেলা বা প্রটোকল না মানার প্রমাণ পাওয়া যায়, তার দায় নির্ধারণ করাও জরুরি।
কারণ ফারহানার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার নামে কাগজে-কলমে কী ব্যবস্থা ছিল আর বাস্তবে কর্মীরা কতটা সুরক্ষিত ছিলেন;সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে এই মৃত্যু। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যদি প্রকৃত কারণ, দায় এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে করণীয় স্পষ্ট না হয়, তাহলে ফারহানার মৃত্যুকে ঘিরে থাকা প্রশ্নগুলো থেকেই যাবে।






























