ঢাকা ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিবপুরে দুজনকে বাঁচিয়ে প্রাণ গেল সৌরভের

বশির আহম্মদ মোল্লা, নরসিংদী
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:৩৭:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 48

শিবপুরে দুজনকে বাঁচিয়ে প্রাণ গেল সৌরভের

নরসিংদীর শিবপুরে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নেমে তীব্র স্রোতে নারী, শিশুসহ পাঁচজন তলিয়ে যেতে থাকেন। তাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেন স্থানীয় তরুণ সৌরভ মিয়া। শিশুসহ দুজনকে নিরাপদে পাড়ে তুলে দেওয়ার পর আরও একজনকে উদ্ধারে ফের নদীতে নামেন তিনি। এ সময় স্রোতের টানে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারান সৌরভ।

শুক্রবার বিকেলে উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামের চর লাখপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে শীতলক্ষ্যা নদীতে এ ঘটনা ঘটে। শনিবার সকাল থেকে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সৌরভসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন মো. শান্ত (২৪)।

নিখোঁজ শান্ত টাঙ্গাইল সদর উপজেলার জুয়েলের ছেলে। তিনি তিতুমীর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তাহমিদ আইটি ডিজিটালে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন।

উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে অন্য দুজন হলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ (৩৮) এবং কাপাসিয়ার ফুলবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইলের স্ত্রী শান্তা আক্তার (২৪)। সৌরভ মিয়া শিবপুরের লাখপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ স্ত্রী শাহীনুর আক্তার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চর লাখপুরে বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে পরিবারের ছয় সদস্য শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নামেন।

গোসলের একপর্যায়ে শান্তা আক্তার পানিতে তলিয়ে যেতে থাকেন। তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে তার বোন শাহীনুর আক্তারও শিশুসন্তানসহ পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকেন। এ সময় ওবায়দুল্লাহ ও শান্ত তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তারাও স্রোতের মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকেন।

পরিস্থিতি দেখে তাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেন সৌরভ। তিনি শিশুসন্তানসহ শাহীনুর আক্তারকে নিরাপদে পাড়ে তুলে আনেন। এরপর অন্যদের উদ্ধারে আবার নদীতে নামলে তীব্র স্রোতে তিনিও তলিয়ে যান। স্থানীয়রা নদীতে নেমে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তবে নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ভৈরব থেকে আসা ডুবুরি দলের সহায়তায় আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। সকাল ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ ও সৌরভের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সাওরাইদ এলাকায় নদীতে শান্তা আক্তারের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়। পরে সেটিও উদ্ধার করা হয়।

বেঁচে যাওয়া শাহীনুর আক্তার বলেন, শান্তা তলিয়ে যাচ্ছিল দেখে তিনি তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে নিজেও পানিতে ডুবে যেতে থাকেন। তখন তার স্বামী ও ভাগনে তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। পরে সৌরভ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে শিশুসহ তাকে পাড়ে তুলে আনেন। তাদের উদ্ধারের পর অন্যদের বাঁচাতে আবার নদীতে নামেন সৌরভ। পরে তিনিও পানিতে তলিয়ে যান।

শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, শুক্রবার নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। শনিবার ডুবুরি দল নিয়ে আবার অভিযান শুরু করা হয়। এ পর্যন্ত তিনজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ শান্তকে উদ্ধারে রোববার সকালে আবার অভিযান চালানো হবে।

সৌরভের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অন্যদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সৌরভ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার এই সাহসিকতার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

শাহীনুরের বাবা সুকচান শেখ ও মা হাসিনা বেগম জানান, দাওয়াত খেতে মেয়ে, জামাই ও নাতি বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার বাড়ির পাশের নদীতে গোসল করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ পাঁচ মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। আরও দুই মাস পর তার সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।

দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. নাসির উদ্দীন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। বেড়াতে এসে নদীতে গোসল করতে নেমে তাদের প্রাণহানি ঘটেছে।

শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া বলেন, নিখোঁজ চারজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাকে উদ্ধারে রোববার আবার অভিযান চালানো হবে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

শিবপুরে দুজনকে বাঁচিয়ে প্রাণ গেল সৌরভের

সর্বশেষ আপডেট ০৮:৩৭:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নরসিংদীর শিবপুরে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নেমে তীব্র স্রোতে নারী, শিশুসহ পাঁচজন তলিয়ে যেতে থাকেন। তাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেন স্থানীয় তরুণ সৌরভ মিয়া। শিশুসহ দুজনকে নিরাপদে পাড়ে তুলে দেওয়ার পর আরও একজনকে উদ্ধারে ফের নদীতে নামেন তিনি। এ সময় স্রোতের টানে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারান সৌরভ।

শুক্রবার বিকেলে উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামের চর লাখপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে শীতলক্ষ্যা নদীতে এ ঘটনা ঘটে। শনিবার সকাল থেকে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সৌরভসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন মো. শান্ত (২৪)।

নিখোঁজ শান্ত টাঙ্গাইল সদর উপজেলার জুয়েলের ছেলে। তিনি তিতুমীর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তাহমিদ আইটি ডিজিটালে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন।

উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে অন্য দুজন হলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ (৩৮) এবং কাপাসিয়ার ফুলবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইলের স্ত্রী শান্তা আক্তার (২৪)। সৌরভ মিয়া শিবপুরের লাখপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ স্ত্রী শাহীনুর আক্তার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চর লাখপুরে বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে পরিবারের ছয় সদস্য শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নামেন।

গোসলের একপর্যায়ে শান্তা আক্তার পানিতে তলিয়ে যেতে থাকেন। তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে তার বোন শাহীনুর আক্তারও শিশুসন্তানসহ পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকেন। এ সময় ওবায়দুল্লাহ ও শান্ত তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তারাও স্রোতের মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকেন।

পরিস্থিতি দেখে তাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেন সৌরভ। তিনি শিশুসন্তানসহ শাহীনুর আক্তারকে নিরাপদে পাড়ে তুলে আনেন। এরপর অন্যদের উদ্ধারে আবার নদীতে নামলে তীব্র স্রোতে তিনিও তলিয়ে যান। স্থানীয়রা নদীতে নেমে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তবে নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ভৈরব থেকে আসা ডুবুরি দলের সহায়তায় আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। সকাল ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ ও সৌরভের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সাওরাইদ এলাকায় নদীতে শান্তা আক্তারের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়। পরে সেটিও উদ্ধার করা হয়।

বেঁচে যাওয়া শাহীনুর আক্তার বলেন, শান্তা তলিয়ে যাচ্ছিল দেখে তিনি তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে নিজেও পানিতে ডুবে যেতে থাকেন। তখন তার স্বামী ও ভাগনে তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। পরে সৌরভ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে শিশুসহ তাকে পাড়ে তুলে আনেন। তাদের উদ্ধারের পর অন্যদের বাঁচাতে আবার নদীতে নামেন সৌরভ। পরে তিনিও পানিতে তলিয়ে যান।

শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, শুক্রবার নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। শনিবার ডুবুরি দল নিয়ে আবার অভিযান শুরু করা হয়। এ পর্যন্ত তিনজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ শান্তকে উদ্ধারে রোববার সকালে আবার অভিযান চালানো হবে।

সৌরভের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অন্যদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সৌরভ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার এই সাহসিকতার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

শাহীনুরের বাবা সুকচান শেখ ও মা হাসিনা বেগম জানান, দাওয়াত খেতে মেয়ে, জামাই ও নাতি বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার বাড়ির পাশের নদীতে গোসল করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ পাঁচ মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। আরও দুই মাস পর তার সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।

দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. নাসির উদ্দীন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। বেড়াতে এসে নদীতে গোসল করতে নেমে তাদের প্রাণহানি ঘটেছে।

শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া বলেন, নিখোঁজ চারজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাকে উদ্ধারে রোববার আবার অভিযান চালানো হবে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।