এসএমই ব্যয় ৫০ শতাংশ কমিয়ে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির রোডম্যাপ প্রকাশ
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৩:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
- / 23
এসএমই শিল্পসমূহের উপর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডিকার্বনাইজেশন সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশনা অনুষ্ঠান।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বিসিক শিল্পনগরীগুলো থেকে বছরে ১৪.০৯ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এর মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিটের সুবিধা ব্যবহার করে বছরে প্রায় ০.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করাও সম্ভব হতে পারে । চীন, ভারত এবং ভিয়েতনামের সাফল্যকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশের এসএমই খাত বিকেন্দ্রীভূত রুফটপ সোলার প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের পরিচালনা ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত মান বজায় রেখে বিশ্ববাজারে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে ।
আজ শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি হোটেলে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ প্রণীত ’এসএমই শিল্পসমূহের উপর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডিকার্বনাইজেশন সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এই তথ্য উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সহ-গবেষক সাবরিন সুলতানা ও নাজিফা আলম তোরসা।
প্রকাশিতব্য গবেষণায় দেখা যায়, দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশের বেশি এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। যা শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োগ করে । জিডিপিতে ২৫-৩০ শতাংশ অবদান রাখছে । এরপরও, এই খাতটি এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল যার প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক। বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে যা উচ্চ ঝুঁকির মুখে রয়েছে ।
বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত থেকে ৬৯.৮৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা শিল্প খাতের জ্বালানি রূপান্তরকে জরুরি করে তুলেছে।
নাজিফা আলম তোরসার মতে, এই গবেষণায় এসএমই ক্লাস্টারগুলোর জ্বালানি ব্যবহার এবং নিঃসরণের একটি বিস্তারিত ও কারখানা-ভিত্তিক মূল্যায়ন তুলে ধরা হয় । গবেষণায় বিসিক শিল্পনগরীর চারটি উচ্চ-প্রভাবশালী খাতের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশল । এই চারটি খাত সম্মিলিতভাবে বছরে আনুমানিক ৪৬.৯৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড কার্বন নিঃসরণ করে। যার মধ্যে কারিগরিভাবে বছরে ১৪.০৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণের ফলাফলে দেখা যায় :
• চামড়া শিল্পে ১৯-৩৩ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা ।
• হালকা প্রকৌশলে ১৯-৩১ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা ।
• প্লাস্টিক উৎপাদনে সর্বোচ্চ ৩৩-৪৯ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা ।
• প্যাকেজিংএ ১৫-২৮ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা ।
তিনি জানান, গবেষণার প্রধান ফলাফলে শিল্পনগরী পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের রূপান্তরমূলক ক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে । বিসিক শিল্পনগরীর মাত্র ১০ শতাংশ খালি জায়গা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করা হয়েছে। যা বছরে ৮২,৯৬৮.৮৮ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে । যা বছরে ৫১,৪৪০.৭১ টন কার্বন ডাই অক্সাইড কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে । এই জায়গার ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করলে ১১৪ মেগাওয়াট সক্ষমতা থেকে ১৬৫,৯৩৭.৭৬ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। যা বছরে ১০২,৮৮১.৪১ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করবে ।
আর্থিক বিশ্লেষণ করলে এই রূপান্তরের যৌক্তিকতাকে আরও শক্তিশালী করে । একটি সাধারণ ২০ কিলোওয়াট রুফটপ সোলার সিস্টেম থেকে দিনে প্রায় ৭৯ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। যা ৪.২ বছরেই বিনিয়োগের টাকা তুলে আনতে পারে । কেপেক্স মডেলে ২৩ শতাংশ ইন্টারনাল রেট অফ রিটার্ন নিশ্চিত করে । অন্যদিকে, ওপেক্স মডেলের আওতায় কোনো প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই এসএমইগুলো সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ করতে পারে । তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ বিলের খরচ কমাতে পারে ।
এম জাকির হোসেন খান এই গবেষণার কাঠামোগত প্রভাবের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হলে বিএনপির নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা শুধু কাগজের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের এসএমই খাতের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি। চীন, ভারত এবং ভিয়েতনামের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর তাদের ছোট ব্যবসাগুলোকে গ্রিডের অস্থিরতা এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। যা তাদের কর্মসংস্থান ও সক্ষমতা হারানো ছাড়াই সম্ভব হয়েছে।”
গবেষণাটিতে যন্ত্রাংশ-ভিত্তিক জ্বালানি মূল্যায়ন, উৎপাদন ম্যাপিং এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের যাচাইকৃত ডেটা ব্যবহার করে নিঃসরণের একটি শক্তিশালী বেসলাইন তৈরি করা হয়েছে ।
সাবরিন সুলতানা বলেন, প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি গবেষণায় কিছু কাঠামোগত বাধাও চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন: স্বল্প সুদে অর্থায়নের অভাব, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি এবং মানসম্মত জ্বালানি অডিট ব্যবস্থার অনুপস্থিতি । এই বাধাগুলো দূর করতে গবেষণায় তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি ক্লাস্টার-ভিত্তিক ডিকার্বোনাইজেশন পাথওয়ে বা পথনকশা প্রস্তাব করা হয়েছে।
• শিল্পনগরী পর্যায়ে অংশীদারিত্বমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ।
• ওপেক্স এবং স্বল্প সুদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়নের মতো উদ্ভাবনী আর্থিক মডেল প্রবর্তন করা ।
• বিসিক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা ।
এম জাকির হোসেন খান সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বর্তমান সংকটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং জ্বালানি বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে এসএমই খাতের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব কেবল একটি জলবায়ু ইস্যু নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক টিকে থাকার কৌশল। বিসিকের মতো ক্লাস্টারগুলোতে রুফটপ সোলার, গ্রিন ফাইন্যান্সিং এবং জ্বালানি দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিলে একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। ট্যাক্স বেনিফিট, ইনসেন্টিভ এবং উদ্ভাবনী অর্থায়ন যেমন প্রগতিশীল কার্বন ট্যাক্স ও জনহিতকর অনুদান আমাদের আর্থিক বোঝা এবং ঋণের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
তিনি সরকারের কাছে কৃষকদের ‘কৃষক কার্ডে’র মতো এসএমইদের ‘এসএমই কার্ড’ প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন।
গবেষণার ফলাফলগুলো এসএমই ডিকার্বোনাইজেশনকে কেবল একটি জ্বালানি পরিকল্পনা হিসেবে নয়, বরং একটি উচ্চ-প্রভাবশালী অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর ফলে সরাসরি উৎপাদন খরচ কমবে, মুনাফা বাড়বে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে – যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে ।



































