ঢাকা ১০:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এসএমই খাতে ব্যয় ৫০% কমানোর রোডম্যাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:০৯:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
  • / 50

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব—এমনই এক সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। একই সঙ্গে এই খাতকে পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের মাধ্যমে রপ্তানি সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপও প্রকাশ করা হয়েছে।

শনিবার (২৮ মার্চ) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে ‘এসএমই শিল্পসমূহের উপর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডিকার্বনাইজেশন সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান এবং সহ-গবেষক সাবরিন সুলতানা ও নাজিফা আলম তোরসা।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশেরও বেশি এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত, যা শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং জাতীয় জিডিপিতে ২৫-৩০ শতাংশ অবদান রাখে। তবে এই খাতের প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, যা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিক শিল্পনগরীগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে বছরে প্রায় ১৪.০৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এর ফলে কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে প্রায় ০.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ও হতে পারে।

গবেষণায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশল—বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য: চামড়া শিল্পে ১৯-৩৩%, হালকা প্রকৌশলে ১৯-৩১%, প্লাস্টিক উৎপাদনে ৩৩-৪৯% এবং প্যাকেজিং খাতে ১৫-২৮% পর্যন্ত নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব।

এছাড়া, বিসিক শিল্পনগরীর মাত্র ১০ শতাংশ খালি জায়গায় রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করবে। এই ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়তে পারে।

আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি ২০ কিলোওয়াট সোলার সিস্টেম প্রায় ৪.২ বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনতে সক্ষম। পাশাপাশি ওপেক্স মডেলের মাধ্যমে কোনো প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই এসএমই উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ খরচ কমাতে পারবেন।

গবেষণায় কিছু চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন—স্বল্প সুদের অর্থায়নের অভাব, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি এবং মানসম্মত জ্বালানি অডিট ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। এসব বাধা দূর করতে ক্লাস্টারভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা, উদ্ভাবনী অর্থায়ন মডেল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

এম জাকির হোসেন খান বলেন, এসএমই খাতের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক টিকে থাকারও বিষয়। চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের উদাহরণ অনুসরণ করে বাংলাদেশেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত এসএমই খাতকে বিশেষ সুবিধা দিতে ‘এসএমই কার্ড’ চালু করা, যা কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো কাজ করবে।

গবেষণাটি এসএমই খাতকে শুধু একটি শিল্পখাত নয়, বরং দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, মুনাফা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে—যা দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এসএমই খাতে ব্যয় ৫০% কমানোর রোডম্যাপ

সর্বশেষ আপডেট ০৬:০৯:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব—এমনই এক সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। একই সঙ্গে এই খাতকে পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের মাধ্যমে রপ্তানি সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপও প্রকাশ করা হয়েছে।

শনিবার (২৮ মার্চ) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে ‘এসএমই শিল্পসমূহের উপর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডিকার্বনাইজেশন সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান এবং সহ-গবেষক সাবরিন সুলতানা ও নাজিফা আলম তোরসা।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশেরও বেশি এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত, যা শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং জাতীয় জিডিপিতে ২৫-৩০ শতাংশ অবদান রাখে। তবে এই খাতের প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, যা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিক শিল্পনগরীগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে বছরে প্রায় ১৪.০৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এর ফলে কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে প্রায় ০.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ও হতে পারে।

গবেষণায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশল—বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য: চামড়া শিল্পে ১৯-৩৩%, হালকা প্রকৌশলে ১৯-৩১%, প্লাস্টিক উৎপাদনে ৩৩-৪৯% এবং প্যাকেজিং খাতে ১৫-২৮% পর্যন্ত নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব।

এছাড়া, বিসিক শিল্পনগরীর মাত্র ১০ শতাংশ খালি জায়গায় রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করবে। এই ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়তে পারে।

আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি ২০ কিলোওয়াট সোলার সিস্টেম প্রায় ৪.২ বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনতে সক্ষম। পাশাপাশি ওপেক্স মডেলের মাধ্যমে কোনো প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই এসএমই উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ খরচ কমাতে পারবেন।

গবেষণায় কিছু চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন—স্বল্প সুদের অর্থায়নের অভাব, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি এবং মানসম্মত জ্বালানি অডিট ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। এসব বাধা দূর করতে ক্লাস্টারভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা, উদ্ভাবনী অর্থায়ন মডেল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

এম জাকির হোসেন খান বলেন, এসএমই খাতের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক টিকে থাকারও বিষয়। চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের উদাহরণ অনুসরণ করে বাংলাদেশেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত এসএমই খাতকে বিশেষ সুবিধা দিতে ‘এসএমই কার্ড’ চালু করা, যা কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো কাজ করবে।

গবেষণাটি এসএমই খাতকে শুধু একটি শিল্পখাত নয়, বরং দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, মুনাফা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে—যা দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।