ড্যাপ সংশোধনে স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবের অভিযোগ
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:১১:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / 54
রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনী পুনর্বিবেচনা, সংশোধনের প্রক্রিয়ায় পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং স্বাধীন পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ববিহীন কারিগরি কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় রাজধানীর বাংলামটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। ‘পরিকল্পনা না মানলে বাসযোগ্য ঢাকা নয়: ড্যাপ সংশোধনী পুনর্বিবেচনা ও স্বাধীন পেশাজীবীবিহীন কারিগরি কমিটি বাতিলের দাবি’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিআইপি।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, গত ১৪ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ড্যাপ ২০২২–২০৩৫-এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্যামপুর-কদমতলী এলাকায় বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী তিনটি প্লটের ভূমি ব্যবহার ‘উন্মুক্ত স্থান’ থেকে ‘ভারী শিল্প এলাকা’ করা, পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পে শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) অনুমোদন এবং ওয়াটার ফ্লো ওভারলে জোনের নির্দেশনার সঙ্গে ভূমি ব্যবহারের বিরোধ দেখা দিলে তা নির্ধারণে নতুন বিধান যুক্ত করা।
তিনি বলেন, এসব সংশোধনীর ফলে নগরের উন্মুক্ত স্থান, জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংরক্ষণের পরিকল্পনাগত ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ও বায়ুদূষণপ্রবণ শ্যামপুর-কদমতলী এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, পূর্বাচল ও ঝিলমিলে অতিরিক্ত এফএআর অনুমোদন নগরের অবকাঠামো ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিআইপি সভাপতি আরও বলেন, ড্যাপ সংশোধনের জন্য গঠিত নয় সদস্যের কারিগরি কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে কোনো পেশাজীবী সংগঠন, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ কিংবা নাগরিক প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নেই। অথচ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নেওয়া জরুরি। ড্যাপের নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদি পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমন্বিত গবেষণা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন আনা উচিত।
তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনা না মেনে কোনো শহর বাসযোগ্য হতে পারে না, ঢাকাও হবে না।’ বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, খাল ও জলাধার বিলুপ্তি, যানজট, শব্দদূষণ, উন্মুক্ত স্থানের সংকট, নগর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও আবাসন সংকটসহ নানা সমস্যায় ঢাকা এমনিতেই বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় পরিকল্পনার মূল কাঠামো দুর্বল করে এমন সিদ্ধান্ত নগরের বাসযোগ্যতাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মুসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, ২০২৩ সালে রাজউক ড্যাপের গেজেট প্রকাশের পর একাধিকবার পর্যালোচনা ও সংশোধনের মাধ্যমে এটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু গত ১৪ অক্টোবরের গেজেটে হঠাৎ কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় পরিবর্তনগুলো বিশেষ একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে করা হয়েছে বলে বিআইপি মনে করে। এসব সিদ্ধান্তের পেছনের কারিগরি প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বদলে তা লঙ্ঘনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের সংকট থাকা সত্ত্বেও ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব ও অনিয়ম দূর করতে না পারলে সরকারের পরিকল্পিত উন্নয়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক ও সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বর্তমানে ‘পরিকল্পনার ফ্যাসিবাদ’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে জনস্বার্থ ও পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করে আসছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে পরিকল্পনা লঙ্ঘনের প্রবণতা বেড়েছে।
তিনি বলেন, পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ মানুষের মতামত উপেক্ষা করে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। একদিকে সরকার খাল খনন ও জলাধার সংরক্ষণের কথা বলছে, অন্যদিকে সংরক্ষিত এলাকায় আবাসিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পূর্বাচলে নির্বিচারে এফএআর বাড়ানোর বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ড্যাপের জনস্বার্থবিরোধী সংশোধনী বাদ দেওয়ার আহ্বান জানান এই পরিকল্পনাবিদ।
বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ সংগঠনটির সাত দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, ড্যাপ সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটিতে পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর ড্যাপ পর্যালোচনা ও সংশোধনের কথা থাকলেও বিশেষ প্রয়োজনে পরিবর্তন আনতে হলে তা বিচ্ছিন্নভাবে করা উচিত নয়। সংশোধন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৪ অক্টোবরের সংশোধনী পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর না করা; বর্তমান কারিগরি কমিটি বাতিল করে পেশাজীবী ও নাগরিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিটি গঠন; সংশোধনী প্রণয়ন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত; পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগরের বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব মূল্যায়ন; স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক পর্যালোচনা নিশ্চিত করা; সংশোধনীর কারিগরি যুক্তি সম্পর্কে রাজউকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ এবং নগর ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন (এসইএ) বাধ্যতামূলক করা।
প্রশ্নোত্তর পর্বে পূর্বাচলে ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া প্লটের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মু. মুসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যমান প্লট বরাদ্দ বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি পূর্বাচলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রকৃত আবাসনপ্রত্যাশীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মু. মুসলেহ উদ্দিন হাসানের সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য পরিকল্পনাবিদ মো. মাহবুবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মো. শহীদুল্লাহ, বোর্ড সদস্য (ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল লিয়াজোঁ) পরিকল্পনাবিদ তালহা তাসনিমসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাংবাদিক।
পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলামের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষ হয়।














