নিজস্ব সৌরশক্তিতে জ্বালানি সংকট সমাধানের পরামর্শ
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:১৫:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
- / 26
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ এখন এক বড় সন্ধিক্ষণে। একদিকে জ্বালানি সংকট যখন চরমে, অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর বিপুল চাপ ও পরিবেশ বিপর্যয়। এই সংকট থেকে উত্তরণে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তাকে উচ্চাকাঙ্খী কিন্তু বাস্তবসম্মত ও অপরিহার্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে এই পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ – সঠিক প্রযুক্তি, অর্থের যোগান, ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই পথনকশা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার ( ০৪ মে) রাজধানীর প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে একশনএইড বাংলাদেশ, বিএসআরইএ এবং জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেটবিডি) যৌথ আয়োজিত প্রেস ব্রিফ্রিংয়ে দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জ্বালানি সংকট নিরসনসহ দেশকে জ্বালানি সার্বভৌমত্বের পথে এগিয়ে নিতে একটি সামাজিক, কারিগরি ও অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেন।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার এক অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব নবায়নযোগ্য সম্পদের ব্যবহারই বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে সাশ্রয়ী সমাধান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি জমি রক্ষা করে ‘এগ্রো-ভল্টাইক্স’ মডেল এবং শিল্প-কারখানা, ব্যক্তিমালিকানাসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদ ব্যবহার করেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। তবে এর জন্য গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন এবং সৌর যন্ত্রাংশের ওপর থেকে উচ্চ আমদানি শুল্ক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসাথে, জ্বালানি খাতের এই রূপান্তর যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারী সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত উন্নয়ন’ নিশ্চিত করে, সেই দাবিও জানানো হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় সোলার: জ্বালানি সাশ্রয়ের বড় অস্ত্র জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “আমরা যদি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ করতে পারি, তবে এটি কয়েক হাজার কোটি ডলারের এলএনজি বা কয়লা আমদানির বোঝা কমিয়ে দেবে।”
তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুৎ এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটিই হবে দেশের জ্বালানি খাতের মূল চালিকাশক্তি। তিনি বিশেষভাবে জোর দেন ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) এর ওপর, যাতে দিনের বাড়তি বিদ্যুৎ রাতেও ব্যবহার করা যায় এবং গ্রিড স্থিতিশীল থাকে।
জমির অভাব নিয়ে প্রচলিত বিতর্ক নাকচ করে দিয়ে ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন (বিজিইএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, “আমাদের কৃষি জমিতেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।” তিনি ‘এগ্রো-ভল্টাইক্স’ মডেলের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্যানেলের নিচে ছায়া-সহিষ্ণু ফসল উৎপাদন হবে এবং উপরে বিদ্যুৎ মিলবে। এছাড়া নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ (Floating Solar) প্রকল্পগুলোকে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে আইইইএফএ (IEEFA)-র লিড জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান যে, কেবল গার্মেন্টস ও বড় শিল্প কারখানার ছাদগুলো ব্যবহার করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তিনি বলেন, “নেট মিটারিং পদ্ধতিকে আরও উৎসাহিত করলে শিল্প মালিকরাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। এতে সরকারের ওপর চাপ কমবে এবং কারখানার উৎপাদন খরচও হ্রাস পাবে।”
জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. জাকির হোসেন খান বলেন, “জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছতা দূর করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, তার একটি অংশ যদি সৌরবিদ্যুৎ খাতে স্থানান্তর করা যায়, তবে কোনো বিদেশি ঋণ ছাড়াই এই ১০ হাজার মেগাওয়াট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব।” তিনি জলবায়ু তহবিলের অর্থ সরাসরি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যবহারের দাবি জানান।
তিনি বলেন, “দেশের জরুরি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ ও সেচ) সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে ৩-৬ মাসের মধ্যেই এই খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব। পরনির্ভরশীল মেগা প্রজেক্টের পরিবর্তে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে গুরুত্ব না দেওয়া আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”
ব্যবসায়ী সংগঠন বিএসআরইএ (BSREA)-র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানিতে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক এই খাতের বড় বাধা। তিনি বলেন, “আমরা বিনিয়োগ করতে চাই, কিন্তু ১০টি দপ্তরে দৌড়াতে গিয়ে প্রকল্প ঝুলে যায়। এই খাতের জন্য একটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এখনই সময়ের দাবি।”
নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা ও পথনকশা উপস্থাপন শীর্ষক ধারণাপত্র পাঠ করেন জেটনেটবিডির সদস্য লিপি রহমান। তিনি বলেন, এই ১০ হাজার মেগাওয়াট যেন কেবল বড় শিল্পপতিদের পকেটে না যায়। প্রান্তিক নারী, কৃষক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে একটি ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।
জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া বলেন “আমদানিকৃত জ্বালানির মোহ ত্যাগ করে আমাদের নিজস্ব নবায়নযোগ্য সম্পদের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্মার্ট গ্রিড এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা সৌরবিদ্যুৎকেই দেশের মূল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি।”
২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা কেবল একটি স্বপ্ন নয়, এটি কারিগরিভাবে সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত পথনকশা, যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না এবং গ্রিড আধুনিকায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত ও কমিউনিটি-ভিত্তিক মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
একশনএইড বাংলাদেশ-এর জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন টিমের ম্যানেজার ও জেটনেট বিডির সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সঞ্চালনায় এসময় উলাশী সৃজনী সংঘ (ইউএসএস)-এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আজিজুল হক মনিসহ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
































