ঢাকা ০৭:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাশিয়া ছেড়ে ইউরোপের পথে আর্মেনিয়া

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৩৭:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
  • / 13

দক্ষিণ ককেশাসে দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নড়ে উঠছে—মস্কোর ঘনিষ্ঠ বলয় থেকে সরে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে আর্মেনিয়া।

আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান এখন এক ব্যতিক্রমী কূটনৈতিক চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপের ৩০টির বেশি দেশের শীর্ষ নেতা, এমনকি কানাডার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সেখানে জড়ো হচ্ছেন—যা দেশটির জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক সম্মেলন নয়, বরং রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সোমবার শুরু হয়েছে ইউরোপীয় পলিটিক্যাল কমিউনিটির শীর্ষ সম্মেলন। এর পরদিন প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-আর্মেনিয়া দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক। এতে অংশ নিচ্ছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কোস্তা। আর্মেনিয়ার জন্য এটি নিছক কূটনৈতিক আয়োজনের বাইরে গিয়ে একটি অবস্থানগত বার্তা হিসেবেও পড়ছে।

ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আর্মেনিয়া এখনো ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সদস্য। দেশটিতে রুশ সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে, আর জ্বালানি খাতে মস্কোর ওপর নির্ভরতা এখনো বাস্তবতা হয়ে আছে। তুলনামূলকভাবে কম দামে গ্যাস পাওয়া গেলেও সেই সম্পর্কই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

পরিবর্তনের সূচনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের নাগোরনো-কারাবাখ সংঘর্ষের পর। ওই সময় আজারবাইজানের সামরিক অভিযানে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ হারায় আর্মেনিয়া, বাস্তুচ্যুত হয় এক লাখের বেশি মানুষ। অভিযোগ ওঠে, রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও মস্কো কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল—যা আর্মেনিয়ার নিরাপত্তা আস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।

এর পর থেকেই ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে নতুন গতি পেতে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় সীমান্ত আলোচনায় অগ্রগতি, বেসামরিক পর্যবেক্ষণ মিশন মোতায়েন এবং আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ইউরোপকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করে ইয়েরেভান।

২০২৫ সালের মার্চে পার্লামেন্টে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া শুরু করার আইন পাস এই পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক দিকও সামনে আনে। যদিও এটি পূর্ণ সদস্যপদের নিশ্চয়তা নয়, তবু রাজনৈতিক অভিমুখ বদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আর্মেনিয়া-আজারবাইজান চুক্তি এবং একটি আঞ্চলিক করিডোর পরিকল্পনা—যা ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে—পরিস্থিতিকে আরও জটিল কিন্তু গতিশীল করে তুলেছে। তবে শান্তি এখনো স্থিতিশীল নয়; কূটনৈতিক টানাপোড়েনও সময় সময় বাড়ছে।

মস্কোর প্রতিক্রিয়া একেবারেই আড়ালে নেই। ভ্লাদিমির পুতিন সরাসরি সতর্ক করেছেন, একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা বাস্তবে কঠিন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ও নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে।

বিশ্লেষকেরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, চাপ কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; তথ্যযুদ্ধ ও সাইবার প্রভাবের মতো অপ্রচলিত কৌশলও সক্রিয় হতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এই উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

ইউরোপ অবশ্য আর্মেনিয়াকে সহযোগিতা ও ভিসা সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তবে পূর্ণ সদস্যপদ বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—কোনোটিই এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে আর্মেনিয়া কার্যত এক জটিল ভারসাম্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে ঐতিহাসিক মিত্র রাশিয়া, অন্যদিকে সম্ভাবনাময় ইউরোপ।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

রাশিয়া ছেড়ে ইউরোপের পথে আর্মেনিয়া

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৩৭:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

দক্ষিণ ককেশাসে দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নড়ে উঠছে—মস্কোর ঘনিষ্ঠ বলয় থেকে সরে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে আর্মেনিয়া।

আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান এখন এক ব্যতিক্রমী কূটনৈতিক চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপের ৩০টির বেশি দেশের শীর্ষ নেতা, এমনকি কানাডার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সেখানে জড়ো হচ্ছেন—যা দেশটির জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক সম্মেলন নয়, বরং রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সোমবার শুরু হয়েছে ইউরোপীয় পলিটিক্যাল কমিউনিটির শীর্ষ সম্মেলন। এর পরদিন প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-আর্মেনিয়া দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক। এতে অংশ নিচ্ছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কোস্তা। আর্মেনিয়ার জন্য এটি নিছক কূটনৈতিক আয়োজনের বাইরে গিয়ে একটি অবস্থানগত বার্তা হিসেবেও পড়ছে।

ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আর্মেনিয়া এখনো ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সদস্য। দেশটিতে রুশ সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে, আর জ্বালানি খাতে মস্কোর ওপর নির্ভরতা এখনো বাস্তবতা হয়ে আছে। তুলনামূলকভাবে কম দামে গ্যাস পাওয়া গেলেও সেই সম্পর্কই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

পরিবর্তনের সূচনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের নাগোরনো-কারাবাখ সংঘর্ষের পর। ওই সময় আজারবাইজানের সামরিক অভিযানে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ হারায় আর্মেনিয়া, বাস্তুচ্যুত হয় এক লাখের বেশি মানুষ। অভিযোগ ওঠে, রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও মস্কো কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল—যা আর্মেনিয়ার নিরাপত্তা আস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।

এর পর থেকেই ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে নতুন গতি পেতে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় সীমান্ত আলোচনায় অগ্রগতি, বেসামরিক পর্যবেক্ষণ মিশন মোতায়েন এবং আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ইউরোপকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করে ইয়েরেভান।

২০২৫ সালের মার্চে পার্লামেন্টে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া শুরু করার আইন পাস এই পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক দিকও সামনে আনে। যদিও এটি পূর্ণ সদস্যপদের নিশ্চয়তা নয়, তবু রাজনৈতিক অভিমুখ বদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আর্মেনিয়া-আজারবাইজান চুক্তি এবং একটি আঞ্চলিক করিডোর পরিকল্পনা—যা ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে—পরিস্থিতিকে আরও জটিল কিন্তু গতিশীল করে তুলেছে। তবে শান্তি এখনো স্থিতিশীল নয়; কূটনৈতিক টানাপোড়েনও সময় সময় বাড়ছে।

মস্কোর প্রতিক্রিয়া একেবারেই আড়ালে নেই। ভ্লাদিমির পুতিন সরাসরি সতর্ক করেছেন, একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা বাস্তবে কঠিন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ও নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে।

বিশ্লেষকেরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, চাপ কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; তথ্যযুদ্ধ ও সাইবার প্রভাবের মতো অপ্রচলিত কৌশলও সক্রিয় হতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এই উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

ইউরোপ অবশ্য আর্মেনিয়াকে সহযোগিতা ও ভিসা সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তবে পূর্ণ সদস্যপদ বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—কোনোটিই এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে আর্মেনিয়া কার্যত এক জটিল ভারসাম্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে ঐতিহাসিক মিত্র রাশিয়া, অন্যদিকে সম্ভাবনাময় ইউরোপ।