আকাশে ভাসছে প্লাস্টিক, বদলে যাচ্ছে বৃষ্টির ধরন!
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪২:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬
- / 5
প্লাস্টিক দূষণ মানেই কি শুধু নদী, সমুদ্র বা মাটির সমস্যা? যদি বলা হয়, প্লাস্টিক এখন আকাশেও ভাসছে? শুধু তাই নয়; সেই প্লাস্টিক বদলে দিচ্ছে মেঘের গঠন, বৃষ্টির ধরন, এমনকি পৃথিবীর জলবায়ুর ভবিষ্যৎও।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে- মানবসভ্যতার তৈরি প্লাস্টিক বর্জ্য এখন বায়ুমণ্ডলের অদৃশ্য ঘাতকে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক বিস্ময়কর গবেষণায় উঠে এসেছে, বাতাসে ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মেঘের ভেতর প্রবেশ করছে এবং বরফ গঠনের প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
সাধারণত বিশুদ্ধ জলবিন্দু মাইনাস ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বরফে পরিণত হয়। কিন্তু যখন সেই জলে প্লাস্টিক কণা মিশে যায়, তখন জল অনেক বেশি তাপমাত্রাতেই জমে যেতে পারে। অর্থাৎ, প্লাস্টিক কণা যেন বরফ তৈরির অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকযুক্ত জলবিন্দুর অর্ধেকেরও বেশি মাইনাস ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই জমাট বাঁধছে। এ পরিবর্তন ছোট মনে হলেও এর প্রভাব বিশাল। কারণ মেঘের গঠন, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত- সবকিছুই নির্ভর করে জলকণার আচরণের ওপর।

জাপানের মাউন্ট ফুজি এবং চীনের মাউন্ট তাইয়ের উপরের মেঘ থেকে সংগৃহীত নমুনায় বিজ্ঞানীরা চার ধরনের প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- কম ঘনত্বের পলিথাইলিন, পলিপ্রোপাইলিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, পলিথাইলিন টেরেফথালেট যা পিইটি নামে পরিচিত। অর্থাৎ, আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের বোতল, প্যাকেট, কাপড়, টায়ার- সবকিছুর ক্ষুদ্র কণা আকাশে উঠে যাচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। যখন মেঘে অতিরিক্ত ভাসমান কণা জমা হয়, তখন অসংখ্য ক্ষুদ্র জলবিন্দু তৈরি হয়। এসব ছোট জলকণার বড় হয়ে বৃষ্টিতে পরিণত হতে বেশি সময় লাগে। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কমে যায়। আর যখন বৃষ্টি হয়, সেটি হয়ে ওঠে হালকা, অনিয়মিত।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা- এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। জলবায়ুর ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ, প্লাস্টিক শুধু দূষণ করছে না; এটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক জলচক্রেও হস্তক্ষেপ করছে।
এখন প্রশ্ন হলো- এই প্লাস্টিক আকাশে উঠছে কীভাবে? গবেষণা বলছে- গাড়ির টায়ারের ক্ষয়, সিন্থেটিক কাপড়ের তন্তু, শিল্পাঞ্চলের প্লাস্টিক বর্জ্য এবং শহুরে প্লাস্টিকের অবক্ষয়। এসব থেকেই তৈরি হচ্ছে অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা, যা বাতাসে মিশে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়, মেঘ, বরফ, নদী— সর্বত্র। এমনকি মানুষের শরীরেও।
নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করা এই কণাগুলো ফুসফুসে প্রদাহ, টিস্যু ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- আমরা হয়তো এমন এক সংকটের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে প্লাস্টিক শুধু পরিবেশ দূষণের কারণ নয় বরং বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনেরও নীরব নিয়ন্ত্রক।
সব ধরনের প্লাস্টিকের প্রভাব আবার এক নয়। কিছু প্লাস্টিক সময়ের সঙ্গে বরফ তৈরির ক্ষমতা হারালেও, পিইটি- এর মতো কিছু উপাদান আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, সমস্যা আরও জটিল।
মানবসভ্যতা এক সময় প্লাস্টিককে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এখন সেই প্লাস্টিকই হয়তো জলবায়ু, কৃষি, পানিসম্পদ এবং মানবস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার



































