শারদীয় দুর্গাপূজার ধর্মীয় তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:২০:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 20
আমাদের ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম। আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বী। প্রাচীনকালে আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেকে সিন্ধু নদের নিকটবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতেন। এ কারণে প্রচলিত ভাষায় আমরা হিন্দু নামে পরিচিত। আমরা হিন্দুধর্মাবলম্বী।
শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জগন্মাতা, মহামায়া ও শক্তিরূপিণী দেবী দুর্গার আরাধনা। বছরে দুই সময়ে দেবী দুর্গার পূজা অনুষ্ঠিত হয়; বসন্তকালে বাসন্তীপূজা এবং শরৎকালে শারদীয় দুর্গাপূজা। শরৎকালের দুর্গাপূজাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শারদীয় দুর্গোৎসব বা বড় পূজা হিসেবে উদ্যাপন করেন।
পুরাণকথা অনুসারে, দেবী দুর্গা দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন। তিনি জীবনের দুর্গতি নাশ করেন বলেও তাঁকে দুর্গা বা দুর্গতিনাশিনী বলা হয়। যিনি দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেন, তিনিই দেবী দুর্গা। বসন্তকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত।
ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রী রামচন্দ্র রাবণকে বধ করার উদ্দেশ্যে দক্ষিণায়নকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন বলে ধর্মীয় কাহিনিতে বর্ণিত আছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই ঘটনা থেকেই শরৎকালে দুর্গাপূজার বিশেষ প্রচলন ঘটে। সনাতন ধর্মীয় পঞ্জিকা অনুসারে, মাঘ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়নকাল। ধর্মীয় বিশ্বাসে উত্তরায়ণ দেবদেবীর জাগরণের এবং দক্ষিণায়ন তাঁদের নিদ্রার সময় হিসেবে বিবেচিত।
শারদীয় দুর্গাপূজার আগে দেবীকে জাগ্রত করার জন্য পূজার আগের দিন সন্ধ্যায় বোধন করা হয়। দুর্গাপূজার বোধনমন্ত্রে রাবণবধের জন্য শ্রী রামচন্দ্রের অকালে দেবীকে জাগ্রত করার প্রসঙ্গ রয়েছে। এ কারণে শরৎকালের দুর্গাপূজাকে অকালবোধনের পূজাও বলা হয়। পূজায় দেবীর অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করা হয়। দেবতাদের স্তব ও স্তুতিতে দেবী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়ে তাঁদের রক্ষা করেছেন বলে পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। আমরা দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপেরও পূজা করি।
দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য বোঝাতে একটি মন্ত্র প্রচলিত আছে; “প্রভাতে যঃ স্মরেন্নিত্যং দুর্গা দুর্গাক্ষরদ্বয়ম্। আপদস্তস্য নশ্যন্তি তমঃ সূর্যোদয়ে যথা।” এর ভাবার্থ হলো, যিনি প্রতিদিন সকালে ভক্তিভরে ‘দুর্গা’ নাম স্মরণ করেন, তাঁর বিপদ সূর্যোদয়ের সঙ্গে অন্ধকার দূর হওয়ার মতো দূর হয়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গার আরাধনায় মনোবাসনা পূরণ ও সিদ্ধিলাভ হয়।
দুর্গাপূজা সাত্ত্বিকভাবে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈদিক রীতি অনুসারে পূজার্চনা, স্তব, দেবীমাহাত্ম্য পাঠ, শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। দেবত্ব, ধর্ম, সত্য ও সাত্ত্বিকতা রক্ষা করতে শক্তির প্রয়োজন। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে সর্বশক্তির আধার দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে সেই শক্তি ও সাহস লাভের প্রার্থনা করা হয়।
মহর্ষি মার্কণ্ডেয় এই পুরাণের বক্তা এবং ক্রৌষ্টুকি ভাগুরি শ্রোতা। শ্রীশ্রী চণ্ডী মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত। গ্রন্থটিতে ১৩টি অধ্যায় রয়েছে। এতে দেবীর আবির্ভাব, অসুরবধ, মহিমা ও উপাসনার কথা বর্ণিত হয়েছে।
চণ্ডীর কাহিনি অনুসারে, একসময় রাজ্যহারা চৈত্রবংশীয় রাজা সুরথ এবং স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবারের কাছ থেকে বিতাড়িত ধনী বৈশ্য সমাধি একটি তপোবনে আশ্রয় নেন। মায়ার টানে রাজা সুরথ তাঁর রাজ্য ও প্রজাদের জন্য এবং বৈশ্য সমাধি তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য চিন্তিত ছিলেন। তাঁরা দুজন পরামর্শ করে তপোবনে সাধনারত মেধা মুনির কাছে যান। মায়ার কারণ জানতে চাইলে মুনি তাঁদের বলেন, এসবই মহামায়ার প্রভাব। তাঁর আরাধনা ও তপস্যায় সন্তুষ্ট হলে দেবী মায়ার আবরণ সরিয়ে দিয়ে জ্ঞানলাভের পথ দেখাতে পারেন।
মেধা মুনি দেবীর বিভিন্ন আবির্ভাব ও অসুরবধের কাহিনি তাঁদের শোনান। পুরাণে বর্ণিত আছে, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী যোগনিদ্রারূপে আবির্ভূত হন এবং মধু ও কৈটভ নামের দুই অসুরের বিনাশে ভূমিকা রাখেন। দেবতাদের স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি মহিষাসুর ও তার বাহিনীকে পরাজিত করেন। এ ছাড়া শুম্ভ-নিশুম্ভ, ধূম্রলোচন, চণ্ড-মুণ্ড ও রক্তবীজের মতো অসুরদের বিনাশের কাহিনিও চণ্ডীতে বর্ণিত হয়েছে। এসব কাহিনিতে দেবীকে অশুভ শক্তির বিনাশকারী এবং দেবতাদের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মেধা মুনি রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধিকে বোঝান, দেবী মহামায়ার প্রভাবেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালিত হয়। তাঁর কৃপায় তত্ত্বজ্ঞান, সুখ-ভোগ, স্বর্গ ও মুক্তি লাভ সম্ভব; এমন বিশ্বাস সনাতন ধর্মীয় দর্শনে রয়েছে।
দেবীর মাহাত্ম্য শুনে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নদীতীরে মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে দেবী দুর্গার আরাধনা ও তপস্যা শুরু করেন। দেবীসূক্ত জপসহ বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে তাঁরা তিন বছর তপস্যা করেন। তাঁদের সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা আবির্ভূত হন এবং বর চাইতে বলেন। রাজা সুরথ নিজের শক্তিতে শত্রুদের পরাজিত করে হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়া এবং পরজন্মে অক্ষয় রাজ্য লাভের বর চান। অন্যদিকে, সংসারের প্রতি আসক্তি হারানো বৈশ্য সমাধি পরম জ্ঞান, অহংবোধের অবসান, ব্রহ্মজ্ঞান ও মুক্তি প্রার্থনা করেন। দেবী তাঁদের প্রার্থনা পূরণের আশ্বাস দেন। ধর্মীয় কাহিনি অনুসারে, দেবীর কৃপায় তাঁদের মনোবাসনা পূর্ণ হয়।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিপদের সময়ে ভক্তিভরে দেবী দুর্গার আরাধনা করলে তিনি ভক্তদের দুর্গতি নাশ করেন। এ কারণেই তাঁর নাম দুর্গতিনাশিনী। ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা নিত্য বর্তমান এবং কৈলাসে স্বামী শিবের সঙ্গে অবস্থান করেন।
দুর্গাপূজার কল্পারম্ভের আগে সন্ধ্যায় দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস করা হয়। সপ্তমী পূজার দিন মৃন্ময়ী প্রতিমায় বৈদিক মন্ত্রের মাধ্যমে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রতিমাকে পূজার উপযোগী করে তোলা হয়। প্রচলিত পঞ্জিকা ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের শারদীয় দুর্গাপূজায় দেবীর আগমন ঘোটকে এবং গমন নৌকায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচলিত ব্যাখ্যায় ঘোটকে আগমনের ফল ছত্রভঙ্গ এবং নৌকায় গমনের ফল শস্য ও জলবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত।
শ্রীশ্রী চণ্ডীতে দেবী ভক্তদের বিপদ থেকে উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছেন। গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকে বলা হয়েছে, “যথাপৎসু স্মৃতা খিলাঃ। ভবতাং নাশয়িষ্যামি তৎক্ষণাৎ পরমাপদঃ।” এর ভাবার্থ হলো, বিপদের সময়ে দেবীকে স্মরণ করলে তিনি ভক্তদের মহাবিপদ থেকে রক্ষা করবেন।
দেবী দুর্গা যুগে যুগে বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়ে দেবতা ও মানুষকে রক্ষা করেছেন; এমন বর্ণনা সনাতন ধর্মীয় গ্রন্থে রয়েছে। তাই দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভশক্তির জাগরণ, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও কল্যাণের প্রত্যাশারও প্রতীক। ভক্তদের বিশ্বাস, মা দুর্গার কৃপায় জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর হবে এবং মানুষের মধ্যে সত্য, ন্যায়, শক্তি ও সাত্ত্বিকতার বিকাশ ঘটবে।






























