আইলায় ঘরহারা
মাছ ধরা মায়ের ছেলে এখন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে
- সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৫:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 14
বাবা মারা যান যখন শরিফুল ইসলামের বয়স মাত্র আড়াই বছর। সংসার চালাতে মা কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো বিলে মাছ ধরেছেন। ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যায় ঘর। অভাবের সঙ্গে লড়াই করে গ্রামের কলেজ থেকে পড়াশোনা করে পৌঁছান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি চালিয়ে যান বিসিএসের প্রস্তুতি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন খুলনার কয়রার বামিয়া গ্রামের শরিফুল ইসলাম। তাঁর এই অর্জন শুধু একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়, একজন মায়ের হার না-মানা জীবনের গল্পও। কখনো কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি জন্ম নেয় সবচেয়ে গভীর কষ্টের ভেতর থেকে। যে শিশু ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই বাবাকে হারায়, যে শিশুর শৈশব কাটে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে, যে শিশুর চোখের সামনে মা সংসার চালাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন; একদিন সেই শিশুই হয়ে ওঠেন মায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মো. শরিফুল ইসলামের জীবনটা অনেকটা তেমনই।
খুলনার কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের বামিয়া গ্রামের ছেলে তিনি। পেশায় রাজমিস্ত্রি বাবা তফেজ উদ্দীন মারা যান ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। তখন শরিফুলের বয়স মাত্র আড়াই বছর। বাবার মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান মা আমেনা বেগম। বয়স তখন মাত্র ২৪-২৫ বছর। যে বয়সে একজন মানুষের নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার কথা, সেই বয়সেই তিনটি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে।
সেদিন থেকে শুরু হয় শরিফুলের পরিবারের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের কেন্দ্রে ছিলেন একজন মা। আর সেই সংগ্রামের শেষ প্রান্তে আজ দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরই সন্তান; ৪৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত শরিফুল ইসলাম।
স্বামী মারা যাওয়ার পর আমেনা বেগমের সামনে নতুন করে সংসার গড়ার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সন্তানদের কথা ভেবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সিদ্ধান্ত নেন, যত কষ্টই হোক, নিজের সন্তানদের মানুষ করবেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁর হাতে অঢেল সম্পদ ছিল না। ছিল না নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা। ছিল শুধু তিনটি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার এক দুর্বার সংকল্প। শরিফুলের নানাও তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। নাতিদের যেন অন্তত দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা হয়, সে জন্য সপ্তাহে একবার বাজার করে দিতেন। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এক বিঘা জমিও তাঁর নামে লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৯ সালের দিকে নানার মৃত্যুর পর সেই আশ্রয়টুকুও হারিয়ে যায়।
এরপর আসে আরও ভয়াবহ এক দুর্যোগ। ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। ভেঙে পড়ে তাঁদের ঘরবাড়ি। চারদিকে পানি, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার লড়াই। নিজেদের ঘর হারিয়ে উঁচু তক্তার ওপর খাট রেখে পানির মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। সেই দুর্বিষহ পরিস্থিতি এক-দুই দিনে কাটেনি; ২০১২ সাল পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে পরিবারটিকে।
তখন আমেনা বেগম কখনো বিলে মাছ ধরেছেন, কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। আবার বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে কাজ করেছেন ৪০ দিনের কর্মসূচিতে। কখনো মানুষের সাহায্য, কখনো যাকাতের টাকায় চলেছে সংসার। একজন মা কতটা অসহায় হলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে এত দূর গিয়ে কাজ করেন! কতটা দৃঢ় হলে নিজের শত কষ্টের মধ্যেও সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেন না!শরিফুলের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা সম্ভবত সেখানেই।
ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না শরিফুল। ডানপিটে স্বভাবের কারণে বইয়ের চেয়ে অন্য কিছুতেই বেশি আগ্রহ ছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফলাফলও ছিল মোটামুটি। তবে শিক্ষকদের স্নেহ পেয়েছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বুঝতে শিখলেন, তাঁর মা কীভাবে প্রতিদিন সংসারের জন্য লড়াই করছেন, তখন নিজের জীবন নিয়েও ভাবতে শুরু করেন।
মায়ের কষ্টগুলো তাঁকে ভেতর থেকে নাড়া দিত। যে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান, যে মা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সন্তানদের মানুষ করার প্রতিজ্ঞা করেছেন, সেই মায়ের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করতে থাকেন তিনি। অষ্টম শ্রেণির শেষ দিকে এসে নিজের সঙ্গে নিজেই যেন একটি চুক্তি করেন শরিফুল।
মেধা কম হোক, পড়া বুঝতে সময় বেশি লাগুক;তবু চেষ্টা থামাবেন না। যতক্ষণ না বুঝতে পারবেন, ততক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকবেন। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয় বড় ভাইয়ের সহযোগিতা। পড়াশোনার পরিকল্পনা, নিয়মিত দিকনির্দেশনা এবং মানসিক শক্তি;সবকিছুতেই বড় ভাই হয়ে ওঠেন তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা।
এরপর শুরু হয় অন্য এক শরিফুলের পথচলা। জেএসসি পরীক্ষায় বৃত্তি পান। ২০১৩ সালে বামিয়া এমএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। একসময় যে পড়াশোনায় তাঁর মন বসত না, সেই পড়াশোনাই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তাঁর জীবন বদলে দেওয়ার হাতিয়ার। এসএসসির পর শরিফুলের বড় ভাই চেয়েছিলেন, তাঁকে শহরের কোনো সরকারি কলেজে ভর্তি করাবেন। সেখানে পড়াশোনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে; এমনটাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল অর্থনৈতিক সংকট। শেষ পর্যন্ত কয়রার খান সাহেব কোমর উদ্দীন ডিগ্রি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন শরিফুল।
শহরের সরকারি কলেজে পড়তে না পারার কষ্ট ছিল। কিন্তু সেই কষ্টকে অজুহাত বানাননি। গ্রামের কলেজে পড়েই নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখেন। কলেজজীবনে বড় ভাইয়ের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে রুটিন তৈরি করেন। পড়াশোনার পেছনে সময় দিতে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো মাসের পর মাস প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা পড়েছেন। এমনও হয়েছে, ঈদের আনন্দ থেকেও নিজেকে দূরে রেখেছেন। তাঁর কাছে তখন ঈদের ছুটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া।
অবশেষে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৮১.২৫ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় ৩৪৪তম স্থান অর্জন করেন শরিফুল। সুযোগ পান ইংরেজি বিভাগে।
বামিয়া গ্রামের সেই ছেলেটি পৌঁছে যান দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মানেই সব কষ্টের অবসান নয়। বরং সেখানে শুরু হয় নতুন ধরনের সংগ্রাম।
ঢাকা শহরে পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ ছিল না। ক্লাস, টিউশনি, লাইব্রেরি; এই ছিল শরিফুলের দিনযাপনের প্রধান অংশ। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতে হয়েছে। ঢাকা শহরের কত জায়গায় কত আয়োজন, কত আনন্দ; সেসব জানার বা উপভোগ করার সুযোগ তাঁর খুব একটা হয়নি। সময়ের বড় অংশ কেটেছে পড়াশোনা আর টিউশনিতে।
তবে এই যাত্রায় অনেক মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র, টিউশনির শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে পেয়েছেন সহযোগিতা। টিউশনির বাসায় গেলে তাঁকে না খাইয়ে ফিরতে দিতেন না কেউ কেউ। সেই ভালোবাসা তাঁর কাছে শুধু খাবার ছিল না; ছিল কঠিন সময়ে মানুষের পাশে থাকার এক অমূল্য স্মৃতি। আজও তাঁদের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন শরিফুল।
তিনি জানেন, একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে শুধু তাঁর নিজের পরিশ্রম থাকে না। থাকে অনেক মানুষের নীরব অবদান, অদৃশ্য সহযোগিতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ২০২৪ সালে জনতা ব্যাংকে অফিসার হিসেবে যোগ দেন শরিফুল। একটি স্থায়ী চাকরি পাওয়ায় পরিবারের জীবনে কিছুটা স্বস্তি আসে।
কিন্তু তাঁর মা ও বড় ভাইয়ের স্বপ্ন তখনো পূর্ণ হয়নি। তাঁরা চাইতেন, শরিফুল বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি ক্যাডার কর্মকর্তা হবেন।শরিফুলও সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন।
দিনভর ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করে বাড়ি ফিরে আবার পড়তে বসতেন। চাকরি, সংসারের দায়িত্ব এবং বিসিএসের প্রস্তুতি; সবকিছু একসঙ্গে সামলানো ছিল কঠিন। তবু হাল ছাড়েননি। এ সময় পাশে ছিলেন মা, বড় ভাই এবং স্ত্রী রাবিনা সুলতানা।
প্রথম দুটি বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। কিন্তু ব্যর্থতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেননি তিনি। আবার প্রস্তুতি নিয়েছেন, আবার পরীক্ষা দিয়েছেন। অবশেষে ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এবং ৪৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন শরিফুল। ৪০তম বিসিএসেও তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে পূরণ হতে চলেছে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। যে তরুণ একসময় আর্থিক সংকটের কারণে সরকারি কলেজে পড়তে পারেননি, সেই তরুণই এখন সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। জীবনের এই বাঁক যেন তাঁকে আবারও ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই পুরোনো দিনগুলোতে; যখন গ্রামের কলেজে পড়ার আক্ষেপ বুকে নিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। আজ সেই আক্ষেপের জায়গায় এসেছে প্রাপ্তির আনন্দ।
শরিফুলের গল্প বলতে গিয়ে শুধু বিসিএসের ফলাফল কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাতালিকার কথা বললে অনেক কিছুই বলা হবে না। এই গল্পে আছে একজন মায়ের দীর্ঘশ্বাস, যিনি স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন নতুন করে। আছে সেই মায়ের ঘাম, যিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করেছেন। আছে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ঘর হারানোর স্মৃতি। আছে বড় ভাইয়ের নিরলস সহযোগিতা, শিক্ষকদের ভালোবাসা, স্ত্রীর সমর্থন এবং পথে পথে পাওয়া অসংখ্য মানুষের সহমর্মিতা।
শরিফুলের সাফল্যের ভেতরে তাই জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের বহু বছরের ত্যাগ। তাঁর কাছে নিজের অর্জন নিয়ে গর্ব করার চেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিষয়টিই বড়। তিনি মনে করেন, এতিম হয়েও তিনি ভাগ্যবান। কারণ, জীবনের কঠিন সময়ে এমন একটি পরিবার, এমন কিছু শিক্ষক এবং এত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, যা তাঁকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শরিফুল বুঝেছেন, অনেক শিক্ষার্থী মেধার অভাবে নয়, বরং আর্থিক সংকট ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে।
তিনি চান, তাঁর মতো কোনো শিক্ষার্থী যেন শুধু অভাবের কারণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে বাধ্য না হয়। কেউ যেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতার অভাবে শিক্ষার পথ থেকে হারিয়ে না যায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে তাঁদের স্বপ্নপূরণের সারথি হতে চান তিনি। নিজের জীবনের সংগ্রাম থেকে পাওয়া শিক্ষা অন্যদের কাজে লাগাতে চান।
হয়তো কোনো একদিন তাঁর কোনো শিক্ষার্থীও আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাববে। সেই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে শরিফুল বলতে পারবেন, পথ কঠিন হলেও চেষ্টা থামানো যাবে না। কারণ, তিনি নিজেই জানেন, প্রতিকূলতা কতটা নির্মম হতে পারে। আবার এটাও জানেন, সঠিক দিকনির্দেশনা, অধ্যবসায় ও মানুষের সহযোগিতা পেলে সেই প্রতিকূলতা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
শরিফুলের সাফল্যের গল্পের শেষটা আনন্দের হলেও তাঁর মায়ের সংগ্রামের দিনগুলো মুছে যাওয়ার নয়। ২০০১ সালে স্বামীকে হারানোর পর যে নারী তিন সন্তানকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেছিলেন, সেই নারী আজ নিজের সন্তানের অর্জনের দিকে তাকিয়ে নিশ্চয়ই ফিরে দেখেন দীর্ঘ পথটিকে। সেই পথে ছিল অভাব, ছিল ঘর হারানোর কষ্ট, ছিল অন্যের বাড়িতে কাজ করার ক্লান্তি। ছিল সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। কিন্তু ছিল না হাল ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা।
আজ শরিফুল যখন শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায়, তখন তাঁর অর্জনের প্রতিটি ধাপে যেন মিশে আছে মায়ের সেই দিনগুলোর স্মৃতি। একসময় যে মা সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে সংগ্রাম করেছেন, আজ সেই মায়ের সন্তান অন্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
খুলনার কয়রার বামিয়া গ্রামের শরিফুল ইসলামের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনে অভাব আসতে পারে, দুর্যোগ আসতে পারে, প্রিয়জন হারানোর বেদনা আসতে পারে। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি থাকলে নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে যেতে পারে।
শরিফুলের কাছে তাই ৪৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া কেবল একটি চাকরি নয়। এটি বাবাকে হারানোর পর শুরু হওয়া সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, মায়ের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানোর নতুন সুযোগ। যে ছেলেটির শৈশব কেটেছে অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে, সেই ছেলেই আজ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাতে চান। আর তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এটাই তিনি শুধু নিজের ভাগ্য বদলাতে চাননি; নিজের কষ্টের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যদের পথও সহজ করে দিতে চান।


































