টিনশেড ঘরে ২২১ শিক্ষার্থীর পাঠদান
খুলনায় দুই দশকেও মেলেনি শিক্ষকদের বেতন
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৫৫:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
- / 165
সকাল ১০টা। বিদ্যালয়ের মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ২২১ শিক্ষার্থী। চলছে শারীরিক কসরত। এরপর জাতীয় সংগীত গেয়ে শুরু হয় দিনের পাঠদান। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় মনে হলেও শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানা সীমাবদ্ধতা। চার কক্ষের একটি টিনশেড ভবনে চলছে শত শত শিক্ষার্থীর পড়াশোনা। পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই, নেই প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক পাখা। গরমে অস্বস্তি নিয়ে ক্লাস করতে হয় শিক্ষার্থীদের। বর্ষায় টিনের চাল দিয়ে পানি পড়লে ব্যাহত হয় পাঠদান।
খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের দেয়াড়া গ্রামের মোহাম্মাদিয়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এটি। প্রত্যন্ত এ এলাকায় শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ২০০৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তি জিল্লুর রহমান মামুন।
প্রতিষ্ঠার দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সংকট কাটেনি। বর্তমানে এখানে ২২১ শিক্ষার্থীর পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ছয়জন শিক্ষক ও একজন কর্মচারী। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে নিবন্ধন পেলেও শিক্ষকদের বেতন-ভাতার নিয়মিত ব্যবস্থা হয়নি। এখনো এমপিওভুক্ত না হওয়ায় আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাঁদের পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন তাঁরা। সংসারের খরচ মেটাতে কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে পড়িয়ে আয় করেন। একদিকে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ; দুই চাপ সামলাতে হচ্ছে তাঁদের। তবু এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখতে তাঁরা পাঠদান বন্ধ করেননি।
বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী নূসরাত জাহান এখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে এ প্লাস পেয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি কলেজে পড়াশোনা করছেন। নিজের সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে নূসরাত বলেন, ‘আমি এই স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে এ প্লাস পেয়েছিলাম। আমার ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদের অনেক অবদান রয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এলাকার অনেক শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দূরের প্রতিষ্ঠানে যেতে হতো। যাতায়াতের অসুবিধাসহ নানা কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানো কঠিন ছিল। মোহাম্মাদিয়া বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামের কাছেই শিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এখন শিশুরা সহজে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুস সামাদ বলেন, ‘এই স্কুলটি আমাদের এলাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নিয়মিত শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও ভালো। তবে অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে। একটি পাকা ভবনসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভবিষ্যতে আরও ভালো হবে।’
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের আর্থিক দুরবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি সহায়তা ও বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভালো। ওই এলাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা খুবই প্রয়োজন ছিল। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি নিবন্ধিত হয়েছে। তাদের পড়ালেখার মান সন্তোষজনক।’
বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে এখন প্রয়োজন পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ, বৈদ্যুতিক পাখি ও একটি পাকা ভবন। পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতন-ভাতার বিষয়টিও জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। তাই বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী।































