মানবদেহে ‘শুকরের’ লিভার প্রতিস্থাপন!

- সময় ০৯:১২:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ মার্চ ২০২৫
- / 23
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা – হু’র মতে, লিভার রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর প্রায় ১৩ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার এবং হেপাটাইটিস ভাইরাস; বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি ও সি।
এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে লিভার প্রতিস্থাপনের চাহিদা বাড়ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষা করেন, কিন্তু দাতার অভাবে অনেকেই বাঁচার সুযোগ পান না।
এই সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে এসেছে চীন। দেশটির বিজ্ঞানীরা শুকরের লিভার বিশেষ পরিবর্তনের মাধ্যমে মানবদেহে প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি চীনের একদল বিজ্ঞানী; এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছেন।
চীনের বিজ্ঞানীদের দাবি, বিষয়টি এক সময় ছিলো কল্পনাতীত। কিন্তু এক চীনা নাগরিকের দেহে সফলভাবে শুকরের লিভার প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
গত ১০ মার্চ চীনের শিয়ান শহরের একটি হাসপাতালে এক মস্তিষ্ক-মৃত ব্যক্তির শরীরে প্রথমবারের মতো এক শুকরের লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। গবেষকদের মতে, এই লিভারটিকে ছয়টি জিন সম্পাদনার মাধ্যমে মানবদেহের উপযোগী করা হয়েছিল।
১০ দিন ধরে চিকিৎসকরা রোগীর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, শুকরের লিভার স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে, পিত্ত নিঃসরণ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন উৎপাদন করছে। তবে রোগীর পরিবারের অনুরোধে এই ট্রায়াল শেষ পর্যন্ত বন্ধ করা হয়।
এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল শুকরের লিভারকে ‘ব্রিজ অর্গান’ হিসেবে ব্যবহার করা অর্থাৎ, এটি মূল লিভারের কার্যক্ষমতাকে সহায়তা করবে এবং রোগীরে মানব লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষা করার সময় দেবে।
চিকিৎসক লিন ওয়াং এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটি ভবিষ্যতে লিভার বিকল হওয়া রোগীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন হতে পারে।

হু’র ২০২৪ সালের হেপাটাইটিস রিপোর্ট অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১.১ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারসহ এ সংক্রান্ত রোগে।
অন্যদিকে হু’র গ্লোবাল অ্যালকোহল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে অ্যালকোহল-সম্পর্কিত লিভার রোগে বছরে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।
গ্লোবোক্যান ২০২০ ডেটা অনুসারে, লিভার ক্যান্সারে বছরে প্রায় ৮ লক্ষ মৃত্যু ঘটে, যা হু-এর গবেষণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
লিভার নিয়ে এই যখন অবস্থা; তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞানীরা জিনগতভাবে পরিবর্তিত পশুর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকজন রোগীর শরীরে শুকরের কিডনি ও হৃদযন্ত্র সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যদিও শুকরের হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপিত দুজন রোগী শেষ পর্যন্ত মারা যান, তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে শুকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ৫৩ বছর বয়সি এক নারী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ফ্রেন্ড এই গবেষণাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে, এটি এখনই মানব লিভারের বিকল্প হতে পারবে না, বরং ভবিষ্যতে লিভার রোগীদের জন্য একটি সহায়ক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চীনা গবেষকরা ভবিষ্যতে জীবিত মানুষের শরীরে শুকরের লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে লিভার দানের ঘাটতি দূর করতে পারবে।