মাওবাদীদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় মোদি সরকার !

- সময় ১০:১৫:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ নভেম্বর ২০২৪
- / 311
ভারতে মাওবাদীদের ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে অস্ত্র সমার্পনের সময়সীমা বেধে দিয়েছে মোদি সরকার। এরপরই স্বশস্ত্র এই সংগঠনের বিরুদ্ধে
সরকারি বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এই মাওবাদী আন্দোলন। তাদের নিয়ে মোদি সরকারের এতো ভয় কিসের।
মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস প্রায় ৫০ বছরের পুরনো। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে এক কৃষক বিদ্রোহ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
এরপর ধীরে ধীরে এই আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। মাওবাদী বা নকশালপন্থীরা মূলত সমাজের
অবহেলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দাবি দাওয়া নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করেছিল।

২০০৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মার্ক্সবাদী ও লেনিনবাদী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধ এবং ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসিআই)
মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)। সিপিআই (মাওবাদী) কে ভারতে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে সন্তাক্ত করা হয়েছে।
সরকারি হিসেবে, ২০১৩ সালে, ভারতের ৭৬টি জেলা “বামপন্থী চরমপন্থার” দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।
২০২০ সালে, তেলেঙ্গানা এবং অন্যান্য অঞ্চলে দলের কার্যক্রম আবার বাড়তে শুরু করে। ছত্তিশগড় প্রায়ই দলের সামরিক তৎপরতায় আক্রান্ত হয়।
মাওবাদীদের মূল ঘাঁটি ভারতের “রেড করিডর” নামে পরিচিত অঞ্চলটি, যা ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলির উপর বিস্তৃত।
এখানকার জনবহুল এলাকাগুলোতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অভাব প্রকট। এ কারণে মাওবাদীরা এই এলাকায় সহজেই নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে।
সিপিআই (মাওবাদী) এই অঞ্চলে তার শক্তি একত্রিত করার এবং একটি সংযুক্ত বিপ্লবী এলাকা স্থাপন করার উদ্দেশ্য নিয়েছে, যা থেকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে চলমান জনযুদ্ধতে অগ্রগতি ঘটানো যায়।
মোদি সরকারের আমলে মাওবাদী আন্দোলনকে দমন করতে “অপারেশন গ্রিন হান্ট” পরিচালনা করেন।
যা ছিল মাওবাদী নিধন অভিযান। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে যে, এই অভিযানে সাধারণ জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও মাওবাদীদের অর্থসংগ্রহে কঠোর পদক্ষেপ নেয় মোদি সরকার।

বিভিন্ন এনজিও’র আড়ালে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতো মাওবাদীরা। যা বন্ধ করতে ফরেন কন্ট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট (এফসিআরএ) নিয়মগুলো বেশ কঠোর করা হয়। কিন্তু তাতেও খুব বেশি কাজে আসেনি।
ভারতের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ি, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে,
এই নকশালদের নেটওয়ার্কের মোট সংগ্রহ ১ হাজার কোটি থেকে বেড়ে আড়াই হাজার কোটি রুপি হয়েছে।
যেই অর্থ দিয়ে প্রতি বছর অস্ত্র সংগ্রহের আনুমানিক বাজেট ২০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছিল।
এই অর্থের একটি বড় অংশ সশস্ত্র ইউনিট স্থাপন, প্রচার শাখা চালানো এবং ক্যাডার নিয়োগের জন্য ব্যবহার করা হয়।
মাওবাদীদের ২০২৬ সালের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করতে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৪ সাল থেকে “রেড করিডর” এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
২০১৯ সালের পর প্রায় ২৫০টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
গত এক বছরে মাওবাদী অধ্যুষিত মূল এলাকায় ৩২টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
এর ফলে, গত বছরে অন্তত ১১৫ জন মাওবাদী নিহত হয়েছে এবং ১২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও ১৫০ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছে।
এছাড়া মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণেরও উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে করে মাওবাদীরা সেখানে সমর্থন হারায়।
কিন্তু, সমস্যাটা এখানেই শেষ নয়। মাওবাদীদের সাথে নানা সময়ে শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর একটি অংশ সংযুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তাদের বক্তব্য হল, দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য এই আন্দোলনকে সমর্থন করা জরুরি। আর এ কারনে মোদি সরকারের নানা উদ্যোগের পরও মাওবাদী আন্দোলন নির্মূল করা যাচ্ছে না।
শেয়ার করুন

মাওবাদীদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় মোদি সরকার !

ভারতে মাওবাদীদের ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে অস্ত্র সমার্পনের সময়সীমা বেধে দিয়েছে মোদি সরকার। এরপরই স্বশস্ত্র এই সংগঠনের বিরুদ্ধে
সরকারি বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এই মাওবাদী আন্দোলন। তাদের নিয়ে মোদি সরকারের এতো ভয় কিসের।
মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস প্রায় ৫০ বছরের পুরনো। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে এক কৃষক বিদ্রোহ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
এরপর ধীরে ধীরে এই আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। মাওবাদী বা নকশালপন্থীরা মূলত সমাজের
অবহেলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দাবি দাওয়া নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করেছিল।

২০০৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মার্ক্সবাদী ও লেনিনবাদী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধ এবং ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসিআই)
মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)। সিপিআই (মাওবাদী) কে ভারতে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে সন্তাক্ত করা হয়েছে।
সরকারি হিসেবে, ২০১৩ সালে, ভারতের ৭৬টি জেলা “বামপন্থী চরমপন্থার” দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।
২০২০ সালে, তেলেঙ্গানা এবং অন্যান্য অঞ্চলে দলের কার্যক্রম আবার বাড়তে শুরু করে। ছত্তিশগড় প্রায়ই দলের সামরিক তৎপরতায় আক্রান্ত হয়।
মাওবাদীদের মূল ঘাঁটি ভারতের “রেড করিডর” নামে পরিচিত অঞ্চলটি, যা ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলির উপর বিস্তৃত।
এখানকার জনবহুল এলাকাগুলোতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অভাব প্রকট। এ কারণে মাওবাদীরা এই এলাকায় সহজেই নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে।
সিপিআই (মাওবাদী) এই অঞ্চলে তার শক্তি একত্রিত করার এবং একটি সংযুক্ত বিপ্লবী এলাকা স্থাপন করার উদ্দেশ্য নিয়েছে, যা থেকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে চলমান জনযুদ্ধতে অগ্রগতি ঘটানো যায়।
মোদি সরকারের আমলে মাওবাদী আন্দোলনকে দমন করতে “অপারেশন গ্রিন হান্ট” পরিচালনা করেন।
যা ছিল মাওবাদী নিধন অভিযান। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে যে, এই অভিযানে সাধারণ জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও মাওবাদীদের অর্থসংগ্রহে কঠোর পদক্ষেপ নেয় মোদি সরকার।

বিভিন্ন এনজিও’র আড়ালে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতো মাওবাদীরা। যা বন্ধ করতে ফরেন কন্ট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট (এফসিআরএ) নিয়মগুলো বেশ কঠোর করা হয়। কিন্তু তাতেও খুব বেশি কাজে আসেনি।
ভারতের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ি, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে,
এই নকশালদের নেটওয়ার্কের মোট সংগ্রহ ১ হাজার কোটি থেকে বেড়ে আড়াই হাজার কোটি রুপি হয়েছে।
যেই অর্থ দিয়ে প্রতি বছর অস্ত্র সংগ্রহের আনুমানিক বাজেট ২০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছিল।
এই অর্থের একটি বড় অংশ সশস্ত্র ইউনিট স্থাপন, প্রচার শাখা চালানো এবং ক্যাডার নিয়োগের জন্য ব্যবহার করা হয়।
মাওবাদীদের ২০২৬ সালের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করতে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৪ সাল থেকে “রেড করিডর” এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
২০১৯ সালের পর প্রায় ২৫০টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
গত এক বছরে মাওবাদী অধ্যুষিত মূল এলাকায় ৩২টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
এর ফলে, গত বছরে অন্তত ১১৫ জন মাওবাদী নিহত হয়েছে এবং ১২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও ১৫০ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছে।
এছাড়া মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণেরও উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে করে মাওবাদীরা সেখানে সমর্থন হারায়।
কিন্তু, সমস্যাটা এখানেই শেষ নয়। মাওবাদীদের সাথে নানা সময়ে শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর একটি অংশ সংযুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তাদের বক্তব্য হল, দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য এই আন্দোলনকে সমর্থন করা জরুরি। আর এ কারনে মোদি সরকারের নানা উদ্যোগের পরও মাওবাদী আন্দোলন নির্মূল করা যাচ্ছে না।