পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি ১১ রাষ্ট্রপতি!

- সময় ০৬:১৫:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৪
- / 275
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন মেয়াদে ১৬ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেরই বিদায় সুখকর হয়নি। কাউকে কাউকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে। আবার অনেককে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
অনেক সময় দেখা গেছে রাষ্ট্রপতির সাথে ক্ষমতাসীন দলের মানসিক দূরত্ব তৈরির কারণে তাদের পদ ছেড়ে যেতে হয়েছে। যে কারণে অনেকেই পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরে যে প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়েছিল সেখানে রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে প্রবাসী সরকারে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে শেখ মুজিব দেশে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, রাষ্ট্রপতি করা হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে। বিচারপতি চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর কর্মস্থলে কিছু মনোবেদনার সম্মুখীন হন। তার বুদ্ধিমত্তা এবং মনোভাবের কারণে সরকারের সাথে দূরত্ব তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি করা হয় মুহম্মদুল্লাহকে। তিনি ছিলেন তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার। তার শাসনকাল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল। মুহম্মদুল্লাহ সাধারণত সরকারি নির্দেশ মেনে কাজ করতেন এবং এ কারণে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার সম্পর্ক সুদৃঢ় ছিল।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহর মেয়াদও শেষ হয়। দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন।
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পর ৫ই নভেম্বর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতাচ্যুত হবার পরে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি। তিনি রাষ্ট্রপতি হলেও তখন রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল কার্যত সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ছিলেন ‘ক্ষমতাহীন’ রাষ্ট্রপতি।
১৯৭৭ সালের ২১ শে এপ্রিল ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করে তিনি পদত্যাগ করেন। মূলত তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়াউর রহমান উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের হত্যার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহ-সভাপতি পদে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন। এর তিনদিন পর, অর্থাৎ ১৯৮২ সালের ৩০ শে মার্চ জেনারেল এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান।
কিন্তু বিচারপতি চৌধুরীর কোনো প্রকার কর্তৃত্ব ছিল না, কারণ ঘোষিত সামরিক আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা ছিল যে সিএমএলএ’র উপদেশ বা অনুমোদন ব্যতীত প্রেসিডেন্ট কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ বা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন না।
আহসান উদ্দিন চৌধুরী ২০ মাসের মতো রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতি হন। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় দুটো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একটি ১৯৮৬ সালে এবং আরেকটি ১৯৮৮ সালে। এ দুটি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিল।
জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ধীরে ধীরে সোচ্চার হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সবগুলো বড় রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন জেনারেল এরশাদ।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারী তিন জোটের অনুরোধে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। উত্তরসূরি নির্বাচন করেই তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে সুপ্রিম কোর্টে ফিরে গিয়েছিলেন।
১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর জাতীয় সংসদের দ্বারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯৬ সালের ৮ অক্টোবর স্বাভাবিকভাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাহাবুদ্দিন আহমদকে আবারো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে সংসদের মাধ্যমে। সে বছরের ৯ই অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি আহমেদ।
২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। কিন্তু সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১শে জুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করেন মি. চৌধুরী। সেসময় বিএনপি সংসদে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেছিল। বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট হবার পর এমন নাটকীয় পদত্যাগের ঘটনা আর ঘটতে দেখা যায়নি।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদের জন্য বিএনপির তরফ থেকে পছন্দ করা হয় অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে। ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০০৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের সাথেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইয়াজউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেয় জিল্লুর রহমানকে। ২০১৩ সালের ২০শে মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান মারা যান। তার বয়স হয়েছিলো ৮৪ বছর।
জিল্লুর রহমানের অসুস্থতার কারণে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন স্পিকার আব্দুল হামিদ। তিনি হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি পরপর দুই মেয়াদে দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
শান্তিপূর্ণভাবে তার বিদায়ের পর নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাকে ঘিরেই বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ
-
সর্বাধিক
Devoloped By: InnoSoln Limited