ঢাকা ১২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরিবর্তন সংস্কৃতির এক অনন্য পুরোধা মাহবুব আলম চাষী

মো. হায়দার আলী খান
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৩২:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 183

গ্রাম উন্নয়নের স্বপ্নসারথি মাহবুব আলম চাষী

মাহবুব আলম চাষী। দেশ গঠনের এক অনন্য আদর্শিক সংগঠক, একটি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) পরনির্ভরতার নিদারুণ অবস্থা থেকে উত্তরণ ও মুক্তির পথ খুঁজছিলেন তিনি। এ জন্য ছেড়েছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোভনীয় চাকরি।

সারা দেশে কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটাতে পারলে দেশের পরনির্ভরতার গ্লানি সমৃদ্ধির সম্মানে পরিণত হবে—এই ভাবনা থেকেই চাকরি ছেড়ে আসেন তিনি। স্থিত হন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। এলাকার কৃষকদের সংগঠিত করে বিশাল গুমাই বিলে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেন। সেখানকার চাষিদের সঙ্গে ক্ষেতে হাতে-কলমে ও শারীরিকভাবে যুক্ত হয়ে কাজ করতেন তিনি। এতে চাষিরা তাকে আপনজনের মতো গ্রহণ করেন এবং ‘চাষী সাহেব’ নামে ডাকতে শুরু করেন। এভাবেই মাহবুব আলম হয়ে ওঠেন ‘মাহবুব আলম চাষী’।

সমবায় ও নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদে সেখানে বিপুল সাফল্য আসে। ওই এলাকায় কৃষকের স্বনির্ভরতা অর্জনের একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়। ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড নোয়াখালীর রামগতি এলাকায় পুনর্বাসন কাজের পাশাপাশি তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সফল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন। জনগণকে সংগঠিত করে উৎপাদন বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব—এই ধারণা তাঁর মধ্যে আরও দৃঢ় হয়।

সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাহবুব আলম চাষীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে। তিনি তখন ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’-এর প্রধান সংগঠক। পরিচয়ের মাধ্যম ছিলেন স্বনির্ভর বাংলাদেশের সমন্বয়কারী এএইচএম নোমান। আমার অফিস থেকে বাহিনীর কর্মকর্তাদের স্বনির্ভর কর্মসূচি বিষয়ে প্রশিক্ষণ সমন্বয়ের জন্য তাঁর সঙ্গে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমাকে।

লম্বাদেহী, ফর্সা ও চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মাহবুব আলম চাষী। নোমান ভাইসহ তাঁর সঙ্গে বসা। প্রথম সভাতেই তিনি তাঁর দর্শন ও ভাবনা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে এ দেশকে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ করতে হবে। বিশ্বে দেশকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে হবে। আর নিজস্ব প্রচেষ্টায় গ্রামবাসীদেরই এ কাজ করতে হবে। সরকারি সহায়তা হবে তাদের অতিরিক্ত শক্তি।

স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলার প্রথম পর্বের এই উন্নয়ন কার্যক্রমের রূপকল্প আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হই এবং অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করি। নোমান ভাই ছিলেন আমার গাইড।

মাহবুব আলম চাষীর সঙ্গে আবারও বসতে হয় স্বনির্ভর বাংলাদেশের মতিঝিল অফিসে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শুরুর প্রস্তুতি নিয়ে। সেখানে তাঁর নির্দেশনা অনুসারে প্রশিক্ষণসূচি তৈরি হয়। বাহিনীর মুখপত্র ‘প্রতিরোধ’-এর একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের পরিকল্পনা করেন তিনি। বিষয়টি আমাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দেন। এত বড় একজন মানুষ বিষয়টি এমন সহজ ও সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে আমি অবাক হয়ে যাই। তাঁর পরামর্শ অনুসারে বিশেষ সংখ্যাটি একটি চমৎকার প্রশিক্ষণ সহায়ক ডকুমেন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়। আমরা কর্মকর্তারা তাঁর মেধাসমৃদ্ধ প্রকাশনা থেকে উপকৃত হয়েছিলাম।

১৯৭৯ সালের অক্টোবর। কিশোরগঞ্জ সদর থানার কাটাবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বিষয়—স্বনির্ভর আন্দোলন ও কার্যক্রম। প্রধান অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী খোন্দকার আব্দুল হামিদ। মাহবুব আলম চাষী, স্বরাষ্ট্র সচিব মহবুবুজ্জামান এবং যুগ্ম সচিব মনযূর উল করীম উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করেন।

মাহবুব আলম চাষী তাঁর স্বভাবসুলভ চমৎকার ভঙ্গিতে সহজ-সরলভাবে স্বনির্ভর আন্দোলনের নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য সবাইকে মুগ্ধ করে। গ্রামের সমাজকর্মে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের তিনি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেন। এর মধ্য দিয়ে সারাদেশে স্বনির্ভর আন্দোলনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে গ্রামে এর ভিত্তি তৈরি হয়।

স্বনির্ভর গ্রাম সরকার গঠনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সমাপনী অনুষ্ঠানের আগের রাতে তিনি এই ক্যাম্পে এসেছিলেন। কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপন করে কথা বলেন। মাঠের তাঁবুতে রাত কাটান। সবার জন্য তৈরি শৌচাগার ব্যবহার করেন। তাঁর নিরাপত্তার জন্য থানা থেকে পাঠানো পুলিশ সদস্যদের ‘প্রয়োজন নেই’ বলে ফেরত পাঠিয়ে দেন। রাতে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল বারী খানের পক্ষ থেকে সবার জন্য দেওয়া চাল-ডালের পাতলা খিচুড়ি পরম তৃপ্তির সঙ্গে থালা চেটে খান তিনি। অসাধারণ জীবনযাপন। সব বিবেচনায় তিনি ছিলেন অনুসরণীয়।

মাহবুব আলম চাষীর সঙ্গে আবার দেখা হয় গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে কর্মকর্তাদের বিভাগীয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। রাত কাটান স্থানীয় সাধারণ ডাকবাংলোয়। গভীর রাত পর্যন্ত কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা ও কাজের পরিকল্পনা করেন। কর্মীদের কাজও ছিল এমনই। পরদিন প্রশিক্ষণে দীর্ঘ উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন। লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভর আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রাম পর্যায়ে বাস্তবায়ন এবং প্রতিটি গ্রামে ‘গ্রাম সরকার’ গঠন। কর্মকর্তাদের চেতনায় নাড়া দিয়ে তিনি তাঁদের প্রত্যয়ী করে তুলেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে আবারও সাক্ষাৎ হয় টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে। রাতযাপন করেন কালিহাতি আনসার ব্যাটালিয়ন সদরে। সকালে তাঁকে শেভ করতে দেখি। তিনি বললেন, ‘দেশি ব্লেড দাড়ি কাটতে চায় না, তাই চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেছে।’ কষ্ট হলেও দেশি ব্লেড ব্যবহার তাঁর দেশপ্রেমের অসাধারণ এক নজির।

উপরের সবগুলো প্রশিক্ষণ কোর্সই ছিল গ্রামে উন্নয়নমুখী কাজে নিয়োজিত আনসার-ভিডিপির কর্মকর্তাদের জন্য। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের প্রচেষ্টায় সারাদেশে স্বনির্ভর আন্দোলন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাঁদের প্রচেষ্টায় গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠে ‘গ্রাম সরকার’। শুরু হয় উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি রক্ষার কার্যক্রম। নতুন এই কর্মসূচিতে আসে বিপুল সাফল্য। দেশকে স্বনির্ভর করার এই আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে সফল হন মাহবুব আলম চাষী।

অত্যন্ত সাদামাটা মানুষটি ছিলেন অসাধারণ। পোশাক; খদ্দরের পাঞ্জাবি, পায়জামা, পায়ে স্যান্ডেল, কাঁধে চটের ব্যাগ। সাধারণ খাবার, সাধারণ জীবনযাপন। তবে স্বনির্ভর আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সব সময় কর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজে এগোতেন। সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়নে কঠোর থাকতেন। কর্মীদের প্রশংসা ও উৎসাহ দিয়ে সব সময় উজ্জীবিত রাখতেন। আবার প্রয়োজনে কঠোর হতেও দেখেছি তাঁকে।

সবাইকে কাজে লাগানোর অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতাও ছিল প্রবল। নিজে বিরামহীনভাবে কাজ করতেন। তবে প্রশংসা ও কৃতিত্ব দিতেন কর্মীদের। বলতেন; ‘এই কর্মী ও ওই কর্মী এসব কাজ করেছে।’

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ও আন্তরিকতা নিয়ে দেশের প্রতিটি গ্রামে ‘গ্রাম সরকার’ গঠনের নিরলস প্রচেষ্টা ছিল তাঁর। সভা, সমাবেশ ও কর্মশালার মাধ্যমে বিবর্তিত এই ধারণার প্রসার ও বাস্তবায়ন ঘটান তিনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, বিশেষ করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গ্রাম সরকার ধারণা এবং এর বাস্তবায়নের ইতিবাচক ফলাফল বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে সরকার ১৯৮০ সালে সারাদেশে সরকারি উদ্যোগে আইনের মাধ্যমে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠন করে।

গ্রামোন্নয়নে অসাধারণ সাফল্য ও পরিবর্তনের সূচনা করে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার। মাত্র দুই বছরের মধ্যে গ্রামে উন্নয়নের ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। নতুন নেতৃত্ব ও কর্মী তৈরি হয়। সার্বিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও শান্তি রক্ষায় এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছিল। সম্ভাবনাসমৃদ্ধ এই কার্যক্রম ১৯৮২ সালে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ বাতিল করে দেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন পররাষ্ট্র সচিব ও সাহসী মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম চাষী দেশে গণতন্ত্রের পরিবর্তে সামরিক শাসন এবং চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি, বিশেষ করে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার স্থগিত হয়ে যাওয়ায় হতাশ হন। ফিরে যান চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কৃষি খামারে। সেখানে নিজে কৃষিকাজ ও মুরগি পালন করে নতুন জীবন শুরু করেন। স্বনির্ভর মাহবুব আলম চাষী নিজের জীবনেও স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

মাহবুব আলম চাষী সড়কপথে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাচ্ছিলেন। পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

মাহবুব আলম চাষীর জন্ম চট্টগ্রামে ১৯২৭ সালের ১ অক্টোবর। সফল এক উন্নয়ন আন্দোলনের এই পথিকৃৎ এখন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তাঁর গ্রামীণ কাজের সূচনাস্থল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চাষী ফার্মের উঁচু টিলায়।

আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত গণসংযোগ কর্মকর্তা
বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

পরিবর্তন সংস্কৃতির এক অনন্য পুরোধা মাহবুব আলম চাষী

সর্বশেষ আপডেট ০১:৩২:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাহবুব আলম চাষী। দেশ গঠনের এক অনন্য আদর্শিক সংগঠক, একটি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) পরনির্ভরতার নিদারুণ অবস্থা থেকে উত্তরণ ও মুক্তির পথ খুঁজছিলেন তিনি। এ জন্য ছেড়েছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোভনীয় চাকরি।

সারা দেশে কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটাতে পারলে দেশের পরনির্ভরতার গ্লানি সমৃদ্ধির সম্মানে পরিণত হবে—এই ভাবনা থেকেই চাকরি ছেড়ে আসেন তিনি। স্থিত হন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। এলাকার কৃষকদের সংগঠিত করে বিশাল গুমাই বিলে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেন। সেখানকার চাষিদের সঙ্গে ক্ষেতে হাতে-কলমে ও শারীরিকভাবে যুক্ত হয়ে কাজ করতেন তিনি। এতে চাষিরা তাকে আপনজনের মতো গ্রহণ করেন এবং ‘চাষী সাহেব’ নামে ডাকতে শুরু করেন। এভাবেই মাহবুব আলম হয়ে ওঠেন ‘মাহবুব আলম চাষী’।

সমবায় ও নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদে সেখানে বিপুল সাফল্য আসে। ওই এলাকায় কৃষকের স্বনির্ভরতা অর্জনের একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়। ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড নোয়াখালীর রামগতি এলাকায় পুনর্বাসন কাজের পাশাপাশি তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সফল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন। জনগণকে সংগঠিত করে উৎপাদন বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব—এই ধারণা তাঁর মধ্যে আরও দৃঢ় হয়।

সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাহবুব আলম চাষীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে। তিনি তখন ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’-এর প্রধান সংগঠক। পরিচয়ের মাধ্যম ছিলেন স্বনির্ভর বাংলাদেশের সমন্বয়কারী এএইচএম নোমান। আমার অফিস থেকে বাহিনীর কর্মকর্তাদের স্বনির্ভর কর্মসূচি বিষয়ে প্রশিক্ষণ সমন্বয়ের জন্য তাঁর সঙ্গে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমাকে।

লম্বাদেহী, ফর্সা ও চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মাহবুব আলম চাষী। নোমান ভাইসহ তাঁর সঙ্গে বসা। প্রথম সভাতেই তিনি তাঁর দর্শন ও ভাবনা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে এ দেশকে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ করতে হবে। বিশ্বে দেশকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে হবে। আর নিজস্ব প্রচেষ্টায় গ্রামবাসীদেরই এ কাজ করতে হবে। সরকারি সহায়তা হবে তাদের অতিরিক্ত শক্তি।

স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলার প্রথম পর্বের এই উন্নয়ন কার্যক্রমের রূপকল্প আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হই এবং অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করি। নোমান ভাই ছিলেন আমার গাইড।

মাহবুব আলম চাষীর সঙ্গে আবারও বসতে হয় স্বনির্ভর বাংলাদেশের মতিঝিল অফিসে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শুরুর প্রস্তুতি নিয়ে। সেখানে তাঁর নির্দেশনা অনুসারে প্রশিক্ষণসূচি তৈরি হয়। বাহিনীর মুখপত্র ‘প্রতিরোধ’-এর একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের পরিকল্পনা করেন তিনি। বিষয়টি আমাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দেন। এত বড় একজন মানুষ বিষয়টি এমন সহজ ও সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে আমি অবাক হয়ে যাই। তাঁর পরামর্শ অনুসারে বিশেষ সংখ্যাটি একটি চমৎকার প্রশিক্ষণ সহায়ক ডকুমেন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়। আমরা কর্মকর্তারা তাঁর মেধাসমৃদ্ধ প্রকাশনা থেকে উপকৃত হয়েছিলাম।

১৯৭৯ সালের অক্টোবর। কিশোরগঞ্জ সদর থানার কাটাবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বিষয়—স্বনির্ভর আন্দোলন ও কার্যক্রম। প্রধান অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী খোন্দকার আব্দুল হামিদ। মাহবুব আলম চাষী, স্বরাষ্ট্র সচিব মহবুবুজ্জামান এবং যুগ্ম সচিব মনযূর উল করীম উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করেন।

মাহবুব আলম চাষী তাঁর স্বভাবসুলভ চমৎকার ভঙ্গিতে সহজ-সরলভাবে স্বনির্ভর আন্দোলনের নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য সবাইকে মুগ্ধ করে। গ্রামের সমাজকর্মে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের তিনি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেন। এর মধ্য দিয়ে সারাদেশে স্বনির্ভর আন্দোলনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে গ্রামে এর ভিত্তি তৈরি হয়।

স্বনির্ভর গ্রাম সরকার গঠনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সমাপনী অনুষ্ঠানের আগের রাতে তিনি এই ক্যাম্পে এসেছিলেন। কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপন করে কথা বলেন। মাঠের তাঁবুতে রাত কাটান। সবার জন্য তৈরি শৌচাগার ব্যবহার করেন। তাঁর নিরাপত্তার জন্য থানা থেকে পাঠানো পুলিশ সদস্যদের ‘প্রয়োজন নেই’ বলে ফেরত পাঠিয়ে দেন। রাতে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল বারী খানের পক্ষ থেকে সবার জন্য দেওয়া চাল-ডালের পাতলা খিচুড়ি পরম তৃপ্তির সঙ্গে থালা চেটে খান তিনি। অসাধারণ জীবনযাপন। সব বিবেচনায় তিনি ছিলেন অনুসরণীয়।

মাহবুব আলম চাষীর সঙ্গে আবার দেখা হয় গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে কর্মকর্তাদের বিভাগীয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। রাত কাটান স্থানীয় সাধারণ ডাকবাংলোয়। গভীর রাত পর্যন্ত কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা ও কাজের পরিকল্পনা করেন। কর্মীদের কাজও ছিল এমনই। পরদিন প্রশিক্ষণে দীর্ঘ উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন। লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভর আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রাম পর্যায়ে বাস্তবায়ন এবং প্রতিটি গ্রামে ‘গ্রাম সরকার’ গঠন। কর্মকর্তাদের চেতনায় নাড়া দিয়ে তিনি তাঁদের প্রত্যয়ী করে তুলেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে আবারও সাক্ষাৎ হয় টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে। রাতযাপন করেন কালিহাতি আনসার ব্যাটালিয়ন সদরে। সকালে তাঁকে শেভ করতে দেখি। তিনি বললেন, ‘দেশি ব্লেড দাড়ি কাটতে চায় না, তাই চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেছে।’ কষ্ট হলেও দেশি ব্লেড ব্যবহার তাঁর দেশপ্রেমের অসাধারণ এক নজির।

উপরের সবগুলো প্রশিক্ষণ কোর্সই ছিল গ্রামে উন্নয়নমুখী কাজে নিয়োজিত আনসার-ভিডিপির কর্মকর্তাদের জন্য। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের প্রচেষ্টায় সারাদেশে স্বনির্ভর আন্দোলন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাঁদের প্রচেষ্টায় গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠে ‘গ্রাম সরকার’। শুরু হয় উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি রক্ষার কার্যক্রম। নতুন এই কর্মসূচিতে আসে বিপুল সাফল্য। দেশকে স্বনির্ভর করার এই আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে সফল হন মাহবুব আলম চাষী।

অত্যন্ত সাদামাটা মানুষটি ছিলেন অসাধারণ। পোশাক; খদ্দরের পাঞ্জাবি, পায়জামা, পায়ে স্যান্ডেল, কাঁধে চটের ব্যাগ। সাধারণ খাবার, সাধারণ জীবনযাপন। তবে স্বনির্ভর আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সব সময় কর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজে এগোতেন। সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়নে কঠোর থাকতেন। কর্মীদের প্রশংসা ও উৎসাহ দিয়ে সব সময় উজ্জীবিত রাখতেন। আবার প্রয়োজনে কঠোর হতেও দেখেছি তাঁকে।

সবাইকে কাজে লাগানোর অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতাও ছিল প্রবল। নিজে বিরামহীনভাবে কাজ করতেন। তবে প্রশংসা ও কৃতিত্ব দিতেন কর্মীদের। বলতেন; ‘এই কর্মী ও ওই কর্মী এসব কাজ করেছে।’

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ও আন্তরিকতা নিয়ে দেশের প্রতিটি গ্রামে ‘গ্রাম সরকার’ গঠনের নিরলস প্রচেষ্টা ছিল তাঁর। সভা, সমাবেশ ও কর্মশালার মাধ্যমে বিবর্তিত এই ধারণার প্রসার ও বাস্তবায়ন ঘটান তিনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, বিশেষ করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গ্রাম সরকার ধারণা এবং এর বাস্তবায়নের ইতিবাচক ফলাফল বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে সরকার ১৯৮০ সালে সারাদেশে সরকারি উদ্যোগে আইনের মাধ্যমে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠন করে।

গ্রামোন্নয়নে অসাধারণ সাফল্য ও পরিবর্তনের সূচনা করে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার। মাত্র দুই বছরের মধ্যে গ্রামে উন্নয়নের ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। নতুন নেতৃত্ব ও কর্মী তৈরি হয়। সার্বিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও শান্তি রক্ষায় এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছিল। সম্ভাবনাসমৃদ্ধ এই কার্যক্রম ১৯৮২ সালে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ বাতিল করে দেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন পররাষ্ট্র সচিব ও সাহসী মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম চাষী দেশে গণতন্ত্রের পরিবর্তে সামরিক শাসন এবং চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি, বিশেষ করে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার স্থগিত হয়ে যাওয়ায় হতাশ হন। ফিরে যান চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কৃষি খামারে। সেখানে নিজে কৃষিকাজ ও মুরগি পালন করে নতুন জীবন শুরু করেন। স্বনির্ভর মাহবুব আলম চাষী নিজের জীবনেও স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

মাহবুব আলম চাষী সড়কপথে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাচ্ছিলেন। পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

মাহবুব আলম চাষীর জন্ম চট্টগ্রামে ১৯২৭ সালের ১ অক্টোবর। সফল এক উন্নয়ন আন্দোলনের এই পথিকৃৎ এখন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তাঁর গ্রামীণ কাজের সূচনাস্থল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চাষী ফার্মের উঁচু টিলায়।

আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত গণসংযোগ কর্মকর্তা
বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি