কী ঘটেছিলো ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এ !
জিয়া কি কর্নেল তাহেরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন ?

- সময় ১০:৩২:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৪
- / 190
সাল ১৯৭৫, ৭ নভেম্বর। আজ থেকে ৪৯ বছর আগের এই দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে যায়।
দিনটি বিএনপি ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও জাতীয় সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। জাসদও ‘বিপ্লব দিবস’ হিসেবে পালন করে। আওয়ামী লীগ ‘মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার হত্যা দিবস’ হিসেবে দিনটিকে পালন করা শুরু করেছে।
প্রতি বছরই ৭ নভেম্বর এলে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করা হয়, কে কাকে উদ্ধার করেছেন।
কে কাকে হত্যা করেছেন- এসব নিয়ে বিস্তর আলাপও হয়।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট একদমই ব্যতিক্রম। কোন ধরনের কর্মসূচী নেই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী দলগুলোর।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতির যে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয়, যে অনিশ্চয়তা, শঙ্কা ঘিরে ধরেছিল, তার অবসান হয়েছিল ৭ নভেম্বর।

৭ নভেম্বরের মূল চরিত্র ছিলো মূলত তিনজন। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান, সাবেক ক্ষণস্থায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের। তিনজনই সামরিক কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মনে হতে পারে। এটা ঠিক, সংকটের শুরু জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
সংকট বা দ্বন্দ্বটা যদি হয় জেনারেল জিয়া ও জেনারেল খালেদের মধ্যে, তবে মধ্য থেকে এই সংকটে আবির্ভূত হয়েছিলেন কর্নেল তাহের ক্ষমতা দখলের অভিপ্রায় নিয়ে। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর কাজটা তিনি শুরু করেছিলেন খালেদ মোশররফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে – এমনটাই মনে করেন ইতিহাসবিদরা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হবার পর শেখ মুজিব সরকারের তেইশ জন মন্ত্রীর একুশ জনকে সাথে নিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। কিন্তু খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতার নেপথ্যে ছিলেন ১৫ আগস্টের ঘটনার মুল নায়কেরা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) এই ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার অনুগত সৈন্য বাহিনী নিয়ে ৩ নভেম্বর মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। অভ্যুত্থানটি প্রাথমিকভাবে সফলও হয়। কিন্তু তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র তিন দিন। বস্তুতঃ খালেদ মোশাররফ রক্তপাত এড়াতে চেষ্টা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফ রক্তপাতহীন ক্যু করতে গিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করেন। কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের সে সময় নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করছিলেন।
কর্নেল তাহের ছিলেন জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাঙ্খী। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। সৈনিক-অফিসার বৈষম্য তার পছন্দ ছিলনা। তার এই নীতির জন্য তাহের সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক।
জিয়া তার বাসভবনে বন্দী হয়ে থাকেন। খালেদ মোশারফের নির্দেশে তাকে বন্দী করে রাখেন তরুণ ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ। জিয়ার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ একটি ভুল করেন। তিনি ভুলে যান বেডরুমেও একটি টেলিফোন আছে। জিয়া কৌশলে বেডরুম থেকে ফোন করেন তাহেরকে। খুব সংক্ষেপে বলেন “সেভ মাই লাইফ”।
তাহের জিয়ার আহ্বানে সাড়া দেন। তিনি ঢাকাতে তার অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ চাষাড়া থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় তার সফর সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান সফল হয় ৭ নভেম্বর। কর্নেল তাহের, জিয়াউর রহমানকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। ঐ দিনই পাল্টা অভ্যুত্থানে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে।
জাসদ এ ঘটনাকে বিপ্লব বা অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করলেও এ ঘটনাকে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা বলেই মনে করেন অনেকে। তাদের মতে, জাসদ বা তাহেরের পক্ষে এককভাবে কোনো ধরনের অভ্যুত্থান সংগঠনের সক্ষমতা তখনও ছিল না। কর্নেল তাহের জিয়ার কাঁধে বন্দুক রেখে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু এ ঘটনাপ্রবাহের শেষ অঙ্কে জেনারেল জিয়াউর রহমান নেতার ভূমিকায় উপস্থিত হন এবং সবকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। জিয়া সেনাবাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন, যে কারণে শেষ পর্যন্ত কর্নেল তাহের আর টিকতে পারেননি।

জিয়াউর রহমানের সমর্থনে সামরিক বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষ পথে নেমে এসেছিল। জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধা। এসব কারণে জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের একধরনের আস্থা ছিল। এ আস্থাই ১৯৭৫-এর নভেম্বরে জিয়াকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতার দিকে নিয়ে আসে।
ওই সময়ের জাসদের কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে জাসদ এই অভ্যুত্থানে জড়িত হয়নি। বরং কর্নেল তাহের ও গুটি কয়েকজনের সিদ্ধান্ত এই ঘটনায় জড়িয়ে যায় জাসদ।
জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে কর্নেল তাহের গৃহবন্ধী জিয়াকে উদ্ধার করেন। ঐ দিনই পাল্টা অভ্যুত্থানে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে।
কথা ছিল, জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে আনা হবে। তারপর জাসদের অফিসে তাকে এনে তাহেরদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হবে। পরে সিপাহী-জনতার এক সমাবেশ হবে। সেখানে বক্তব্য রাখবেন জিয়া আর তাহের। কিন্তু মুক্ত হওয়ার পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জিয়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে সম্মত হন না। ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা তাকে পরামর্শ দিতে থাকেন। তাহের জিয়াকে ভাষণ দিতে বলেন। জিয়া ভাষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তাহের বুঝতে পারেন জিয়া তাদের সাথে আর থাকছেন না। তিনি পুনরায় সংগঠিত হতে থাকেন। কিন্তু জিয়া বুঝতে পারেন ক্ষমতায় টিকতে হলে তাহেরসহ জাসদকে সরাতে হবে। সেই অনুযায়ী গ্রেফতার হতে থাকেন জাসদের সব নেতারা। তাহেরও গ্রেফতার হন।
১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। অন্যান্য নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদের জেল হয়। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের কারিগর ছিলেন তাহের। আর তার ফলে ক্ষমতায় বসেন জিয়া।