ইয়াহিয়া সিনওয়ার: হার না মানা এক যোদ্ধা | Bangla Affairs
০৬:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ইয়াহিয়া সিনওয়ার: হার না মানা এক যোদ্ধা

নিউজ ডেস্ক
  • সময় ১২:১৪:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০২৪
  • / 278

Yahya Sinwar

গাজায় ইহুদিবাদী দখলদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ইয়াহিয়া সিনওয়ার। তার হত্যার ঘটনা স্পষ্ট যে সিনওয়ার হামাসের সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকার পরিবর্তে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তার যুদ্ধ সামরিক বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে এগিয়ে থাকা ইসরায়েলের কথিত শ্রেষ্ঠত্বের বিপক্ষে সন্দেহের জন্ম দেয়।

৬২ বছর বয়সের ইয়াহিয়া ইব্রাহিম হাসান আল-সিনওয়ার, যিনি আবু ইব্রাহিম নামেও পরিচিত। ১৯৬২ সালে গাজায় জন্মগ্রহণ করেন সিনওয়ার, যখন গাজা দমন-পীড়ন, কারফিউ, গ্রেপ্তার ও তল্লাশিসহ ইসরায়েলি সামরিক দখলদারিত্বে বেষ্টিত ছিল। কৈশোর থেকেই সিনওয়ার নিজ ভুখণ্ডের নিপীড়িত মানুষের সাথে গভীর এক বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৭২ সালে যখন তার বয়স মাত্র ১১ বছর, তখন ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে সামরিকভাবে ইসরায়েলকে মোকাবেলা করার নতুন আরব প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তীতে বেশ কিছু সাক্ষাৎকারে যার বর্ণনা দিয়েছিলেন। আমরা দেখেছি বিজয়ের আশা ভেঙে পড়েছে, বিশেষ করে যখন মিশরের নেতা আনোয়ার সাদাত শান্তির জন্য ইসরায়েলি পার্লামেন্টে গিয়েছিলেন, যাকে আমি স্বাধীন ফিলিস্তিন চিন্তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখি।

১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে গাজায় প্রথম সংগ্রাম শুরু হয়, যা ছিল ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রথম জনপ্রিয় বিদ্রোহ এবং দ্রুত পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘটনার সূত্রপাত ইসরায়েলি সামরিক গাড়ির আঘাতে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়াকে কেন্দ্র করে। পরে জানা যায় তা ছিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ইচ্ছাকৃত হত্যা।

এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে ফিলিস্তিনিরা; যাদের অধিকাংশই ছিল তরুণ। পরের দিন প্রভাবশালী নেতা ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য শেখ আহমেদ ইয়াসিন গাজার আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে তার সহযোগীদের জড়ো করেন। দীর্ঘ আলাপ শেষে ইসরায়েলকে নির্মূল করার লক্ষ্যে পিএলওর বিকল্প হিসেবে হামাস প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। একই দিনে সেখান থেকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রকে ‘ইহুদি নাৎসিবাদ’ বলে অভিযুক্ত করে এবং হামাসের প্রতিষ্ঠা সনদের খসড়াও তৈরি করা হয়।

সিনওয়ার ছিলেন হামাসের নিরাপত্তা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ইসরাইলে হামলার জন্য দায়ী প্রধান ব্যক্তি হিসাবে সিনওয়ারের দিকে নজর ছিল ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার। প্রতিশোধ নিতে তাঁকে হত্যার ছক আঁকে গোয়েন্দারা।

২০০৪ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে শেখ আহমেদ ইয়াসিনকে সিনওয়ার তার আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পরামর্শদাতা আখ্যায়িত করেন। সূচনা থেকেই হামাস জিহাদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি সংগ্রামকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা আধ্যাত্মিক এবং সামরিক উভয় দিকেই।

১৯৮৮ – ২০১১ সাল পর্যন্ত ২২ বছরের চারটি যাবজ্জীবন সাজা নিয়ে বন্দী জীবনকে মুক্তির সংগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখেছেন সিনওয়ার। জেল জীবন সিনওয়ারের প্রভাব ও পরিচালনার ক্ষমতাকে প্রবল করেছে, যাকে তিনি শত্রুর ভাষা, মনোবিজ্ঞান এবং ইতিহাস শেখার বিদ্যাপীঠ বিবেচনা করেছেন।

অনেক ফিলিস্তিনি বন্দীর মতো, ইয়াহিয়া সিনওয়ার ইসরায়েলি কারাগারে সময়ের সদ্ব্যবহার করে হিব্রু ভাষা শিখে ইসরায়েলি সংবাদপত্র পড়তেন, হিব্রু রেডিও শুনতেন এবং জায়নবাদী তত্ত্ব ও ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের বই পড়তেন।

বন্দী জীবন সত্ত্বেও, সিনওয়ার তার মুক্তির দিনটির জন্য অব্যাহত প্রস্তুতি নিয়েছেন শক্তিশালী প্রতিরোধের আশায়। তার দৃঢ়তাই তাঁকে একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মুক্তির পর সিনওয়ার অতি দ্রুত গাজায় হামাসের নেতৃত্ব গ্রহণ করে মোহাম্মদ দেইফকে সাথে নিয়ে গত ৫০ বছরের মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিধ্বংসী অপারেশন ‘আল-আকসা ফ্লাড’ পরিচালনা করেন।

৭ অক্টোবর ২০২৩ ইসরায়েলে হামাস হামলা চালায়। হামলার সেনা সদস্য, বিদেশি নাগরিকসহ মোট এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। পরে তা সংশোধন করে নিহতের সংখ্যা করা হয়েছে এক হাজার ২০০ জন।

অন্যদিকে, গত বছরের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজায় ৪২ হাজার ১০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৯৭ হাজার ৭২০ জন, যা বিশ্ব রাজনীতিকে নাড়া দিয়েছে। এরপর থেকে সিনওয়ার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।

শেয়ার করুন

ইয়াহিয়া সিনওয়ার: হার না মানা এক যোদ্ধা

সময় ১২:১৪:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০২৪

গাজায় ইহুদিবাদী দখলদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ইয়াহিয়া সিনওয়ার। তার হত্যার ঘটনা স্পষ্ট যে সিনওয়ার হামাসের সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকার পরিবর্তে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তার যুদ্ধ সামরিক বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে এগিয়ে থাকা ইসরায়েলের কথিত শ্রেষ্ঠত্বের বিপক্ষে সন্দেহের জন্ম দেয়।

৬২ বছর বয়সের ইয়াহিয়া ইব্রাহিম হাসান আল-সিনওয়ার, যিনি আবু ইব্রাহিম নামেও পরিচিত। ১৯৬২ সালে গাজায় জন্মগ্রহণ করেন সিনওয়ার, যখন গাজা দমন-পীড়ন, কারফিউ, গ্রেপ্তার ও তল্লাশিসহ ইসরায়েলি সামরিক দখলদারিত্বে বেষ্টিত ছিল। কৈশোর থেকেই সিনওয়ার নিজ ভুখণ্ডের নিপীড়িত মানুষের সাথে গভীর এক বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৭২ সালে যখন তার বয়স মাত্র ১১ বছর, তখন ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে সামরিকভাবে ইসরায়েলকে মোকাবেলা করার নতুন আরব প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তীতে বেশ কিছু সাক্ষাৎকারে যার বর্ণনা দিয়েছিলেন। আমরা দেখেছি বিজয়ের আশা ভেঙে পড়েছে, বিশেষ করে যখন মিশরের নেতা আনোয়ার সাদাত শান্তির জন্য ইসরায়েলি পার্লামেন্টে গিয়েছিলেন, যাকে আমি স্বাধীন ফিলিস্তিন চিন্তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখি।

১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে গাজায় প্রথম সংগ্রাম শুরু হয়, যা ছিল ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রথম জনপ্রিয় বিদ্রোহ এবং দ্রুত পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘটনার সূত্রপাত ইসরায়েলি সামরিক গাড়ির আঘাতে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়াকে কেন্দ্র করে। পরে জানা যায় তা ছিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ইচ্ছাকৃত হত্যা।

এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে ফিলিস্তিনিরা; যাদের অধিকাংশই ছিল তরুণ। পরের দিন প্রভাবশালী নেতা ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য শেখ আহমেদ ইয়াসিন গাজার আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে তার সহযোগীদের জড়ো করেন। দীর্ঘ আলাপ শেষে ইসরায়েলকে নির্মূল করার লক্ষ্যে পিএলওর বিকল্প হিসেবে হামাস প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। একই দিনে সেখান থেকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রকে ‘ইহুদি নাৎসিবাদ’ বলে অভিযুক্ত করে এবং হামাসের প্রতিষ্ঠা সনদের খসড়াও তৈরি করা হয়।

সিনওয়ার ছিলেন হামাসের নিরাপত্তা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ইসরাইলে হামলার জন্য দায়ী প্রধান ব্যক্তি হিসাবে সিনওয়ারের দিকে নজর ছিল ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার। প্রতিশোধ নিতে তাঁকে হত্যার ছক আঁকে গোয়েন্দারা।

২০০৪ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে শেখ আহমেদ ইয়াসিনকে সিনওয়ার তার আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পরামর্শদাতা আখ্যায়িত করেন। সূচনা থেকেই হামাস জিহাদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি সংগ্রামকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা আধ্যাত্মিক এবং সামরিক উভয় দিকেই।

১৯৮৮ – ২০১১ সাল পর্যন্ত ২২ বছরের চারটি যাবজ্জীবন সাজা নিয়ে বন্দী জীবনকে মুক্তির সংগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখেছেন সিনওয়ার। জেল জীবন সিনওয়ারের প্রভাব ও পরিচালনার ক্ষমতাকে প্রবল করেছে, যাকে তিনি শত্রুর ভাষা, মনোবিজ্ঞান এবং ইতিহাস শেখার বিদ্যাপীঠ বিবেচনা করেছেন।

অনেক ফিলিস্তিনি বন্দীর মতো, ইয়াহিয়া সিনওয়ার ইসরায়েলি কারাগারে সময়ের সদ্ব্যবহার করে হিব্রু ভাষা শিখে ইসরায়েলি সংবাদপত্র পড়তেন, হিব্রু রেডিও শুনতেন এবং জায়নবাদী তত্ত্ব ও ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের বই পড়তেন।

বন্দী জীবন সত্ত্বেও, সিনওয়ার তার মুক্তির দিনটির জন্য অব্যাহত প্রস্তুতি নিয়েছেন শক্তিশালী প্রতিরোধের আশায়। তার দৃঢ়তাই তাঁকে একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মুক্তির পর সিনওয়ার অতি দ্রুত গাজায় হামাসের নেতৃত্ব গ্রহণ করে মোহাম্মদ দেইফকে সাথে নিয়ে গত ৫০ বছরের মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিধ্বংসী অপারেশন ‘আল-আকসা ফ্লাড’ পরিচালনা করেন।

৭ অক্টোবর ২০২৩ ইসরায়েলে হামাস হামলা চালায়। হামলার সেনা সদস্য, বিদেশি নাগরিকসহ মোট এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। পরে তা সংশোধন করে নিহতের সংখ্যা করা হয়েছে এক হাজার ২০০ জন।

অন্যদিকে, গত বছরের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজায় ৪২ হাজার ১০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৯৭ হাজার ৭২০ জন, যা বিশ্ব রাজনীতিকে নাড়া দিয়েছে। এরপর থেকে সিনওয়ার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।