ইতিহাসে পূর্ণ মেয়াদ শেষ না করা ১১ রাষ্ট্রপতি | Bangla Affairs
০৭:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসে পূর্ণ মেয়াদ শেষ না করা ১১ রাষ্ট্রপতি

আকাশ ইসলাম
  • সময় ০১:৫৯:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ নভেম্বর ২০২৪
  • / 276

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১১ জন রাষ্ট্রপতি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বিভিন্ন মেয়াদে ১৬ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের মধ্যে অনেকের বিদায় সুখকর হয়নি; কাউকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে, আবার অনেককে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

অনেক সময় রাষ্ট্রপতির সাথে ক্ষমতাসীন দলের মানসিক দূরত্ব তৈরির কারণে তাদের পদ ছাড়তে হয়েছে। ফলস্বরূপ, তাদের মধ্যে কেউ কেউ পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরে প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে প্রবাসী সরকারে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে শেখ মুজিব দেশে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী হন, আর রাষ্ট্রপতি করা হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে। বিচারপতি চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর কিছু মনোভাবে কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তার ব্যক্তিত্ব এবং মনোভাবের কারণে সরকারের সাথে দূরত্ব তৈরি হয় এবং ১৯৭৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

আবু সাঈদ চৌধুরীর পর রাষ্ট্রপতি হন মুহম্মদুল্লাহ। তিনি তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। তার শাসনকাল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল, কারণ তিনি সাধারণত সরকারি নির্দেশ মেনে কাজ করতেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহর মেয়াদও শেষ করেন। দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন।

শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে, ফলে ৫ নভেম্বর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি বাংলাদেশে প্রথম প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তবে তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিরতিহীনতার কারণে তিনি পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের হত্যার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে এক সামরিক অভূত্থানে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ১৯৮২ সালের ৩০ মার্চ জেনারেল এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান।

কিন্তু বিচারপতি চৌধুরীর কোনো প্রকার কর্তৃত্ব ছিল না, কারণ ঘোষিত সামরিক আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে সিএমএলএ’র উপদেশ বা অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ বা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন না।

আহসান উদ্দিন চৌধুরী ২০ মাস রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তাকে সরিয়ে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতি হন।

জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় দুটো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ১৯৮৬ সালে এবং ১৯৮৮ সালে, কিন্তু এ দুটি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিল।

জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। নব্বইয়ের গণঅভূত্থানের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দ্বারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস, যিনি ১৯৯৬ সালের ৮ অক্টোবর স্বাভাবিকভাবে তাঁর মেয়াদ শেষ করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাহাবুদ্দিন আহমদকে আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তিনি ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কিন্তু সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১শে জুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করেন।

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদে বিএনপির তরফ থেকে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে পছন্দ করা হয়।

২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ইয়াজউদ্দিন আহমদ। বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০০৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের সাথে সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিল্লুর রহমানকে বেছে নেয়। ২০১৩ সালের ২০শে মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিল্লুর রহমান মারা যান।

অন্যদিকে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শেয়ার করুন

ইতিহাসে পূর্ণ মেয়াদ শেষ না করা ১১ রাষ্ট্রপতি

সময় ০১:৫৯:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ নভেম্বর ২০২৪

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১১ জন রাষ্ট্রপতি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বিভিন্ন মেয়াদে ১৬ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের মধ্যে অনেকের বিদায় সুখকর হয়নি; কাউকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে, আবার অনেককে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

অনেক সময় রাষ্ট্রপতির সাথে ক্ষমতাসীন দলের মানসিক দূরত্ব তৈরির কারণে তাদের পদ ছাড়তে হয়েছে। ফলস্বরূপ, তাদের মধ্যে কেউ কেউ পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরে প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে প্রবাসী সরকারে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে শেখ মুজিব দেশে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী হন, আর রাষ্ট্রপতি করা হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে। বিচারপতি চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর কিছু মনোভাবে কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তার ব্যক্তিত্ব এবং মনোভাবের কারণে সরকারের সাথে দূরত্ব তৈরি হয় এবং ১৯৭৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

আবু সাঈদ চৌধুরীর পর রাষ্ট্রপতি হন মুহম্মদুল্লাহ। তিনি তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। তার শাসনকাল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল, কারণ তিনি সাধারণত সরকারি নির্দেশ মেনে কাজ করতেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহর মেয়াদও শেষ করেন। দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন।

শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে, ফলে ৫ নভেম্বর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি বাংলাদেশে প্রথম প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তবে তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিরতিহীনতার কারণে তিনি পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের হত্যার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে এক সামরিক অভূত্থানে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ১৯৮২ সালের ৩০ মার্চ জেনারেল এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান।

কিন্তু বিচারপতি চৌধুরীর কোনো প্রকার কর্তৃত্ব ছিল না, কারণ ঘোষিত সামরিক আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে সিএমএলএ’র উপদেশ বা অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ বা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন না।

আহসান উদ্দিন চৌধুরী ২০ মাস রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তাকে সরিয়ে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতি হন।

জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় দুটো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ১৯৮৬ সালে এবং ১৯৮৮ সালে, কিন্তু এ দুটি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিল।

জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। নব্বইয়ের গণঅভূত্থানের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দ্বারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস, যিনি ১৯৯৬ সালের ৮ অক্টোবর স্বাভাবিকভাবে তাঁর মেয়াদ শেষ করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাহাবুদ্দিন আহমদকে আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তিনি ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কিন্তু সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১শে জুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করেন।

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদে বিএনপির তরফ থেকে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে পছন্দ করা হয়।

২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ইয়াজউদ্দিন আহমদ। বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০০৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের সাথে সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিল্লুর রহমানকে বেছে নেয়। ২০১৩ সালের ২০শে মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিল্লুর রহমান মারা যান।

অন্যদিকে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।