ঢাকা ০৭:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ

জলবায়ু ঝুঁকিতে ২৫ দেশ, ঋণের ভারে দেউলিয়ার পথে

রীতা ভৌমিক, সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:৪০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / 15

মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রায় ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ঋণের ভারে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে জানিয়েছেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও এসব দেশকে অভিযোজন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে ঋণের বোঝা বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক খাতে অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর সমাপনী দিনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের শেষ দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন নাশিদ।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় মালদ্বীপকে প্রতিবছর জাতীয় আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। উপকূল রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ, ভাঙন ঠেকানো এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোজন অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। অথচ এসব সমস্যার জন্য মালদ্বীপ দায়ী নয়। অভিযোজনের ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশটি ঋণের চাপে পড়ছে।

নাশিদ জানান, বর্তমানে মালদ্বীপের বাজেটের প্রায় ২৫ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের খাতে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে নাশিদ বলেন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হচ্ছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় ভাঙন বাড়ছে এবং দ্বীপগুলো বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হলে সামুদ্রিক মাছের প্রজননও বাধাগ্রস্ত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে।

তিনি বলেন, বিশ্বের কিছু দেশ পৃথিবীর সম্পদ ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এর পরিবেশগত মূল্য দিতে হচ্ছে এমন অনেক দেশকে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রায় কোনো দায়ই বহন করে না। নেপাল বা মালদ্বীপের মতো দেশের মানুষ এমন কিছু করেনি, যার কারণে তাদের বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা উপকূল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো দান বা অনুদান নয়, বরং ন্যায্য মূল্য চায় উল্লেখ করে নাশিদ বলেন, এসব দেশ বিশ্বকে যে পরিবেশগত সেবা দিয়ে যাচ্ছে, তার যথাযথ মূল্য দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতি রক্ষা কোনো ব্যয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।

প্রকৃতিভিত্তিক অভিযোজনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কৃত্রিম অবকাঠামোর তুলনায় প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা অনেক বেশি কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী হতে পারে। প্রতি মিটার প্রবাল প্রাচীর পুনরুজ্জীবনে প্রায় ২০ ডলার এবং ম্যানগ্রোভ রোপণে প্রায় ৫ ডলার ব্যয় হয়। বিপরীতে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণে হাজার হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ব্যবহার করে দ্রুত প্রবাল পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন নাশিদ। তিনি বলেন, সাধারণত তটরেখার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হয়। মালদ্বীপের কোনো অংশ সমুদ্রের নিচে চলে গেলে দেশটির রাজনৈতিক সীমানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনই বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

নাশিদ জানান, মালদ্বীপের প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইলের অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে এবং ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব অধিকারও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (ইউএনক্লস) নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, মালদ্বীপের মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলো হারিয়ে যাওয়ার আগেই বিশ্বের আরও অনেক দেশের ভূখণ্ড জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই এটি কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়; মানবজাতির টিকে থাকার স্বার্থেই উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ

জলবায়ু ঝুঁকিতে ২৫ দেশ, ঋণের ভারে দেউলিয়ার পথে

সর্বশেষ আপডেট ০৬:৪০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রায় ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ঋণের ভারে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে জানিয়েছেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও এসব দেশকে অভিযোজন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে ঋণের বোঝা বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক খাতে অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর সমাপনী দিনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের শেষ দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন নাশিদ।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় মালদ্বীপকে প্রতিবছর জাতীয় আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। উপকূল রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ, ভাঙন ঠেকানো এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোজন অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। অথচ এসব সমস্যার জন্য মালদ্বীপ দায়ী নয়। অভিযোজনের ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশটি ঋণের চাপে পড়ছে।

নাশিদ জানান, বর্তমানে মালদ্বীপের বাজেটের প্রায় ২৫ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের খাতে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে নাশিদ বলেন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হচ্ছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় ভাঙন বাড়ছে এবং দ্বীপগুলো বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হলে সামুদ্রিক মাছের প্রজননও বাধাগ্রস্ত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে।

তিনি বলেন, বিশ্বের কিছু দেশ পৃথিবীর সম্পদ ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এর পরিবেশগত মূল্য দিতে হচ্ছে এমন অনেক দেশকে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রায় কোনো দায়ই বহন করে না। নেপাল বা মালদ্বীপের মতো দেশের মানুষ এমন কিছু করেনি, যার কারণে তাদের বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা উপকূল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো দান বা অনুদান নয়, বরং ন্যায্য মূল্য চায় উল্লেখ করে নাশিদ বলেন, এসব দেশ বিশ্বকে যে পরিবেশগত সেবা দিয়ে যাচ্ছে, তার যথাযথ মূল্য দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতি রক্ষা কোনো ব্যয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।

প্রকৃতিভিত্তিক অভিযোজনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কৃত্রিম অবকাঠামোর তুলনায় প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা অনেক বেশি কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী হতে পারে। প্রতি মিটার প্রবাল প্রাচীর পুনরুজ্জীবনে প্রায় ২০ ডলার এবং ম্যানগ্রোভ রোপণে প্রায় ৫ ডলার ব্যয় হয়। বিপরীতে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণে হাজার হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ব্যবহার করে দ্রুত প্রবাল পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন নাশিদ। তিনি বলেন, সাধারণত তটরেখার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হয়। মালদ্বীপের কোনো অংশ সমুদ্রের নিচে চলে গেলে দেশটির রাজনৈতিক সীমানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনই বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

নাশিদ জানান, মালদ্বীপের প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইলের অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে এবং ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব অধিকারও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (ইউএনক্লস) নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, মালদ্বীপের মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলো হারিয়ে যাওয়ার আগেই বিশ্বের আরও অনেক দেশের ভূখণ্ড জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই এটি কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়; মানবজাতির টিকে থাকার স্বার্থেই উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।