হামের চিকিৎসা ব্যয়ে ৯০ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:২৬:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
- / 64
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত পরিবারের অধিকাংশই চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খরচ মেটাতে প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিকেই ঋণ নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) প্রকাশিত যৌথ এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত পরিবারের ৮৯ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ঋণ নিয়েছে এবং ৬১ শতাংশ পরিবার তাদের সঞ্চয় পুরোপুরি বা প্রায় শেষ করে ফেলেছে। এছাড়া ৪ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে সম্পদ বিক্রি করেছে, আর প্রায় ৩ শতাংশ অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবারই জানিয়েছে, তারা আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছে। সবচেয়ে বেশি ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে জরুরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এরপর রয়েছে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তা, যা চেয়েছে ৩৩ শতাংশ পরিবার। এছাড়া ২২ শতাংশ পরিবার খাদ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
এই মূল্যায়ন পরিচালনা করা হয় দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর। জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল হামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিরূপণ এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য নির্বাচন করা। নির্ধারিত ঝুঁকির মানদণ্ডের ভিত্তিতে ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে নির্বাচিত করা হয়েছে, যাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।
জরিপে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই চার বছরের কম বয়সী শিশু। পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোগীর হার ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের হার ৬ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা, যাতায়াত, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে প্রতিটি পরিবারকে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, হাসপাতালে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে হওয়ায় তারা কর্মস্থলে যেতে পারেননি। ফলে আয় কমে গেছে, এমনকি কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন।
রংপুরের বাসিন্দা হাজেরা খাতুন তার ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে জুন মাসে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক খাতে তাদের ৭০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।
হাজেরা খাতুন বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও যাতায়াত, খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এই খরচ মেটাতে তিনি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়েছেন। তার স্বামী সৌদি আরবে কর্মরত হলেও চলতি মাসে বেতন না পাওয়ায় পরিবারটি আরও সংকটে পড়েছে।
জরিপে পেশাগত তথ্য দেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের অধিকাংশের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে দীর্ঘ সময় কাজ করতে না পারলে তাদের জীবিকা সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির এম. আশরাফ আলম বলেন, এই মূল্যায়ন দেখিয়েছে যে হামের প্রাদুর্ভাব শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, বহু পরিবারকে গভীর আর্থিক সংকটেও ফেলেছে। তাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে আইএফআরসি-এর হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের প্রভাব হাসপাতালের সীমানা ছাড়িয়ে পরিবারগুলোর আর্থিক ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। তার মতে, জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা—দুটিই সমানভাবে জরুরি। তিনি তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আইএফআরসি ও অংশীদার সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সরকারের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করছে। এ কার্যক্রমে এক হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। তারা জনগণকে সচেতন করা, টিকাদান কেন্দ্রে সহায়তা দেওয়া, ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য প্রচার এবং দ্রুত চিকিৎসা ও টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
































