ঢাকা ০৫:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সকালে ভিডিও কলে ছেলেকে দেখলেন, বিকেলেই এলো মৃত্যুর খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:০০:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / 636

সকালে ভিডিও কলে ছেলেকে দেখলেন, বিকেলেই এলো মৃত্যুর খবর

রোববার সকাল ১০টা। সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে ভিডিও কলে আট মাসের ছেলে তাসরিফকে দেখছিলেন সোহেল রানা সুমন (৩০)। আদরের সন্তানকে দেখে হয়তো কিছুক্ষণ গল্পও করেছিলেন। কে জানত, ওই ভিডিও কলই হবে বাবা-ছেলের শেষ দেখা। কয়েক ঘণ্টা পরই সৌদি আরবের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান সোহেল।

আট মাসের তাসরিফ এখনও জানে না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না। আর মা আমেনা (২৩) সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন। স্বামীকে হারিয়ে এখন তাঁর সামনে একটাই বড় প্রশ্ন; এত ছোট সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সামনে এগোবেন?

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের বাদল মিয়ার ছেলে সোহেল রানা সুমন। প্রায় ১০ বছর সৌদি আরবে থাকার পর দেড় বছর আগে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। দেশে এসে আমেনাকে বিয়ে করেন। পরে পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবার সৌদি আরবে ফিরে যান। এরই মধ্যে তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় ছেলে তাসরিফ।

দীর্ঘ প্রবাসজীবনে পরিবারের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন সোহেল। কিন্তু দেড় বছর আগে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা বাদল। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সোহেলই ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব আরও বেশি করে তাঁর ওপর এসে পড়ে।

বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল ছিল দেড় বিঘা জমি। মায়ের কাছে ছিল সামান্য কিছু স্বর্ণালংকার। স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই জমি ও অলংকার বিক্রি করেই আবার সৌদি আরবে পাড়ি জমান সোহেল। স্বপ্ন ছিল, বিদেশে কাজ করে টাকা জমাবেন এবং দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে স্বচ্ছলভাবে সংসার করবেন।

কিন্তু রিয়াদের একটি কারখানার আগুনে থেমে গেল তাঁর সব স্বপ্ন।

স্বজনরা জানান, সন্তানকে ঘিরে সোহেল ও আমেনার অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলেকে ভালোভাবে মানুষ করবেন; এটাই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় আশা। দূর প্রবাস থেকেও নিয়মিত ভিডিও কলে ছেলের খোঁজ নিতেন সোহেল। রোববার সকালেও ছেলেকে দেখতে ভিডিও কল করেছিলেন তিনি। তখনও কেউ ভাবেননি, কয়েক ঘণ্টা পরই সেই হাসিমুখের মানুষটির মৃত্যুসংবাদ আসবে।

সোহেলের মা স্বপ্না বেগমও ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন। স্বামীকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তাঁকে হারাতে হলো সন্তানকে। পরিবারের শেষ বয়সের ভরসা ছিলেন সোহেল। এখন সেই ভরসাও নেই।

সোহেলের একমাত্র ছোট বোন সুবর্ণার কাছেও ভাইয়ের মৃত্যু এখনও অবিশ্বাস্য। বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাইই ছিলেন পরিবারের প্রধান আশ্রয়। ভাইকে হারিয়ে এখন মা ও ভাবির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।

অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সী আমেনার সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আট মাসের শিশুকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, কীভাবে সন্তানকে বড় করবেন, এসব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মনে।

স্বজনরা জানান, প্রবাসে যাওয়ার সময় সোহেলের একটাই লক্ষ্য ছিল; পরিবারকে ভালো রাখা। বাবার রেখে যাওয়া জমি ও মায়ের অলংকার বিক্রি করে বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি। আশা ছিল কিছুদিন পর দেশে ফিরে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করবেন। সেই অপেক্ষার আর শেষ হলো না।

রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে কারখানায় কর্মরত অন্তত ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসন জানিয়েছে। তাঁদেরই একজন সোহেল রানা সুমন।

সোহেলের বাড়িতে এখন শুধু শোক আর কান্না। স্বজনদের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে কয়েক ঘণ্টা আগের সেই দৃশ্য; মোবাইলের পর্দায় বাবাকে দেখে হাসছিল ছোট্ট তাসরিফ। অথচ সেই পর্দার মানুষটিই আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সকালে ভিডিও কলে ছেলেকে দেখলেন, বিকেলেই এলো মৃত্যুর খবর

সর্বশেষ আপডেট ০৫:০০:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

রোববার সকাল ১০টা। সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে ভিডিও কলে আট মাসের ছেলে তাসরিফকে দেখছিলেন সোহেল রানা সুমন (৩০)। আদরের সন্তানকে দেখে হয়তো কিছুক্ষণ গল্পও করেছিলেন। কে জানত, ওই ভিডিও কলই হবে বাবা-ছেলের শেষ দেখা। কয়েক ঘণ্টা পরই সৌদি আরবের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান সোহেল।

আট মাসের তাসরিফ এখনও জানে না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না। আর মা আমেনা (২৩) সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন। স্বামীকে হারিয়ে এখন তাঁর সামনে একটাই বড় প্রশ্ন; এত ছোট সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সামনে এগোবেন?

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের বাদল মিয়ার ছেলে সোহেল রানা সুমন। প্রায় ১০ বছর সৌদি আরবে থাকার পর দেড় বছর আগে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। দেশে এসে আমেনাকে বিয়ে করেন। পরে পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবার সৌদি আরবে ফিরে যান। এরই মধ্যে তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় ছেলে তাসরিফ।

দীর্ঘ প্রবাসজীবনে পরিবারের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন সোহেল। কিন্তু দেড় বছর আগে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা বাদল। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সোহেলই ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব আরও বেশি করে তাঁর ওপর এসে পড়ে।

বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল ছিল দেড় বিঘা জমি। মায়ের কাছে ছিল সামান্য কিছু স্বর্ণালংকার। স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই জমি ও অলংকার বিক্রি করেই আবার সৌদি আরবে পাড়ি জমান সোহেল। স্বপ্ন ছিল, বিদেশে কাজ করে টাকা জমাবেন এবং দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে স্বচ্ছলভাবে সংসার করবেন।

কিন্তু রিয়াদের একটি কারখানার আগুনে থেমে গেল তাঁর সব স্বপ্ন।

স্বজনরা জানান, সন্তানকে ঘিরে সোহেল ও আমেনার অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলেকে ভালোভাবে মানুষ করবেন; এটাই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় আশা। দূর প্রবাস থেকেও নিয়মিত ভিডিও কলে ছেলের খোঁজ নিতেন সোহেল। রোববার সকালেও ছেলেকে দেখতে ভিডিও কল করেছিলেন তিনি। তখনও কেউ ভাবেননি, কয়েক ঘণ্টা পরই সেই হাসিমুখের মানুষটির মৃত্যুসংবাদ আসবে।

সোহেলের মা স্বপ্না বেগমও ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন। স্বামীকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তাঁকে হারাতে হলো সন্তানকে। পরিবারের শেষ বয়সের ভরসা ছিলেন সোহেল। এখন সেই ভরসাও নেই।

সোহেলের একমাত্র ছোট বোন সুবর্ণার কাছেও ভাইয়ের মৃত্যু এখনও অবিশ্বাস্য। বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাইই ছিলেন পরিবারের প্রধান আশ্রয়। ভাইকে হারিয়ে এখন মা ও ভাবির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।

অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সী আমেনার সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আট মাসের শিশুকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, কীভাবে সন্তানকে বড় করবেন, এসব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মনে।

স্বজনরা জানান, প্রবাসে যাওয়ার সময় সোহেলের একটাই লক্ষ্য ছিল; পরিবারকে ভালো রাখা। বাবার রেখে যাওয়া জমি ও মায়ের অলংকার বিক্রি করে বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি। আশা ছিল কিছুদিন পর দেশে ফিরে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করবেন। সেই অপেক্ষার আর শেষ হলো না।

রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে কারখানায় কর্মরত অন্তত ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসন জানিয়েছে। তাঁদেরই একজন সোহেল রানা সুমন।

সোহেলের বাড়িতে এখন শুধু শোক আর কান্না। স্বজনদের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে কয়েক ঘণ্টা আগের সেই দৃশ্য; মোবাইলের পর্দায় বাবাকে দেখে হাসছিল ছোট্ট তাসরিফ। অথচ সেই পর্দার মানুষটিই আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।