যে তারকাদের হাতছাড়া করে আফসোসে ক্লাবগুলো
- সর্বশেষ আপডেট ০১:০৭:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
- / 58
২০২৩ সালে টটেনহ্যামে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন ওঠার সময় স্ট্রাইকার গিফট অরবানকে ফুটবলের অন্যতম প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ছবি: বিবিসি স্পোর্টস
ফুটবলের দলবদলের মৌসুম এলেই সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় নতুন স্বপ্ন। কোনো তারকা খেলোয়াড়ের সঙ্গে প্রিয় ক্লাবের নাম জড়ালেই কল্পনায় ভেসে ওঠে নতুন সাফল্য, শিরোপা কিংবা বদলে যাওয়া দলের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সব গুঞ্জন বাস্তবে রূপ নেয় না। কখনো ক্লাবের অনীহা, কখনো আর্থিক জটিলতা, আবার কখনো খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্তে ভেস্তে যায় সম্ভাব্য বড় দলবদল।
তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতছাড়া হওয়া খেলোয়াড় পরে বিশ্বতারকায় পরিণত হয়ে ক্লাবের আক্ষেপ বাড়ান। আবার কিছু প্রতিভাবান ফুটবলারের ক্যারিয়ার প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছায় না। নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার গিফট অরবানের গল্পটি এমনই এক উদাহরণ।
২০২৩ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ স্ট্রাইকার হিসেবে আলোচনায় ছিলেন অরবান। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। নরওয়ের শীর্ষ লিগের ক্লাব স্টাবেকের হয়ে ২২ ম্যাচে ১৬ গোল করার পর তিনি যোগ দেন বেলজিয়ামের জেন্টে। নতুন ক্লাবেও দুর্দান্ত গোল করার ধারা বজায় রাখেন তিনি। জেন্টের হয়ে প্রথম ২২ ম্যাচে করেন ২০ গোল।
২০২৩ সালের মার্চে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দুই ম্যাচে সাত গোল করে ইউরোপের ফুটবলে আলোড়ন তুলেছিলেন অরবান। বেলজিয়ান লিগে জুলতে ওয়ারেগেমের বিপক্ষে ৬-২ গোলের জয়ে একাই করেন চার গোল। একবিংশ শতাব্দীতে জেন্টের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে চার গোল করার কৃতিত্বও গড়েন তিনি।
এরপর উয়েফা কনফারেন্স লিগের শেষ ষোলোর ম্যাচে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বাসাকশেহিরের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে করেন হ্যাটট্রিক। মাত্র তিন মিনিট ২৫ সেকেন্ডে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে তখন উয়েফার ক্লাব প্রতিযোগিতার ইতিহাসে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ডও গড়েছিলেন তিনি।
সে সময় টটেনহ্যাম হটস্পারের সঙ্গে জোরালোভাবে অরবানের নাম জড়িয়েছিল। ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন বায়ার্ন মিউনিখে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ফলে নতুন একজন গোলদাতা খুঁজছিল টটেনহ্যাম। অরবানকে কেইনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও দেখা হচ্ছিল।
তবে জেন্টের চাওয়া প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের দাম দিতে রাজি হয়নি টটেনহ্যাম। নতুন কোচ অ্যাঞ্জে পোস্টেকোগলুর অধীনে ক্লাবটি শেষ পর্যন্ত দলবদলের বিষয়ে এগোয়নি। ভেস্তে যায় সম্ভাব্য চুক্তি।
এরপর তিন বছরে চারটি ক্লাব বদলেছেন অরবান। ২০২৩-২৪ মৌসুমে জেন্টের হয়ে করেন মাত্র তিন গোল। পরে ফরাসি ক্লাব লিঁওর হয়ে তিনটি এবং জার্মানির হফেনহাইমের হয়ে করেন চার গোল। গত মৌসুমে ইতালিয়ান ক্লাব ভেরোনায় ধারে খেলে সিরি ‘আ’-তে সাত গোল করলেও পুরোনো ধারাবাহিকতা পুরোপুরি ফিরে পাননি।
সর্বশেষ তুরস্কের নবাগত শীর্ষ লিগের ক্লাব আমেদস্পোরে ধারে যোগ দিয়েছেন অরবান। একসময় যাঁকে ইউরোপের পরবর্তী বড় তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তাঁর ক্যারিয়ার এখনো সেই প্রত্যাশার উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।
তবে ইতিহাসে এমন অনেক ফুটবলার আছেন, যাঁদের চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ক্লাবকে দীর্ঘদিন আক্ষেপ করতে হয়েছে।

ম্যানচেস্টার সিটির প্রস্তাব ফিরিয়েছিলেন কাকা
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ব্রাজিলিয়ান তারকা কাকাকে দলে নিতে ১০ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডের বিশাল প্রস্তাব দিয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি। সে সময় প্রস্তাবিত অর্থটি ছিল বিশ্ব রেকর্ড দলবদল ফি-এর দ্বিগুণেরও বেশি।
২০০৭ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী কাকাকে দলে পাওয়ার ব্যাপারে সিটির সমর্থকদের আগ্রহ এতটাই ছিল যে, একজন সমর্থক নাকি নিজের বুকে তাঁর নামের ট্যাটুও করিয়েছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন কাকা। একই বছরের গ্রীষ্মে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন তিনি। প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডে তাঁর সেই দলবদলও বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল। রিয়ালের হয়ে লা লিগা ও স্প্যানিশ কাপ জেতার পর আবার এসি মিলানে ফেরেন তিনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডো সিটি হয়ে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে ক্যারিয়ার শেষ করেন।
বোল্টনে যেতে চেয়েও মত বদলান রিভালদো
২০০৪ সালে ইংলিশ ক্লাব বোল্টন ওয়ান্ডারার্স ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। তখন ক্লাবটির কোচ স্যাম অ্যালারডাইস ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী তারকা রিভালদোকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এসি মিলানে সুযোগ কমে যাওয়ার পর বোল্টনে যোগ দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন রিভালদো। তিনি বলেছিলেন, ক্লাবটিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে চান।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলে গ্রিসের অলিম্পিয়াকোসে যোগ দেন তিনি। সেখানে তিন মৌসুম খেলেন। অন্যদিকে ২০০৪-০৫ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ষষ্ঠ হয়েছিল বোল্টন। লিভারপুলের সমান পয়েন্ট নিয়ে মৌসুম শেষ করেছিল তারা এবং উয়েফা কাপে জায়গা করে নিয়েছিল।

‘জিদানকে কেন, আমাদের তো টিম শেরউড আছে’
১৯৯৫ সালে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের পর ফরাসি মিডফিল্ডার জিনেদিন জিদানকে দলে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স। তখন জিদান ফ্রান্সের ক্লাব বোর্দোর হয়ে খেলছিলেন।
ক্লাব কর্তৃপক্ষ মালিক জ্যাক ওয়াকারকে জিদান ও ফরাসি ফরোয়ার্ড ক্রিস্টোফ দ্যুগারিকে কেনার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু ওয়াকার তখন বিখ্যাত এক মন্তব্য করেছিলেন- ‘আমাদের যখন টিম শেরউড আছে, তখন জিদানকে কেন প্রয়োজন?’
জিদান ও দ্যুগারি ইংল্যান্ডে গিয়ে ক্লাবটির সঙ্গে আলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়নি।
পরে জিদান ফ্রান্সের হয়ে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ এবং ২০০০ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। জুভেন্টাসের হয়ে ইতালিয়ান লিগ এবং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেন তিনি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হন জিদান।
চেলসিতে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন জেরার্ড
২০০৫ সালে লিভারপুলকে নাটকীয়ভাবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানোর পর ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন স্টিভেন জেরার্ড। এসি মিলানের বিপক্ষে ফাইনালে ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে এসে টাইব্রেকারে শিরোপা জিতেছিল লিভারপুল।
এরপর চেলসির কোচ হোসে মরিনহো ইংল্যান্ডের এই মিডফিল্ডারকে দলে নিতে আগ্রহ দেখান। প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। জেরার্ড নতুন চুক্তিতে সই করতেও রাজি ছিলেন না।
তবে শেষ পর্যন্ত পারিবারিক কারণ দেখিয়ে লিভারপুলেই থেকে যান তিনি। পরে ক্লাবটির হয়ে ৭০০-এর বেশি ম্যাচ খেলেন এবং ২০০৭ সালে আবারও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে নেতৃত্ব দেন।
এক দশক পর মরিনহো বলেছিলেন, জেরার্ডকে দলে নিতে না পারা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় দলবদল-হতাশা।

লিভারপুলে যেতে পারতেন এমবাপ্পে
২০১৭ সালে মোনাকোর হয়ে আলো ছড়ানোর সময় লিভারপুলের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাঁর মা লিভারপুলের সমর্থক হওয়ায় ক্লাবটির প্রতি পরিবারের আলাদা আগ্রহও ছিল।
এমবাপ্পে জানিয়েছিলেন, মায়ের প্রিয় ক্লাব হওয়ায় লিভারপুলের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছিল। সে সময় লিভারপুলের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও পরে জানান, এমবাপ্পে ও তাঁর পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত বিমান এবং বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করেছিল ক্লাবটি।
তবে শেষ পর্যন্ত লিভারপুলে না গিয়ে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইয়ে যোগ দেন এমবাপ্পে। পিএসজির হয়ে টানা ছয়টি লিগ শিরোপা জেতার পর ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান তিনি।
ফুলহামের প্রস্তাব ফিরিয়েছিলেন গ্রিজমান
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অবনমন এড়াতে লড়াই করা ইংলিশ ক্লাব ফুলহাম ফরাসি ফরোয়ার্ড আঁতোয়ান গ্রিজমানকে দলে নিতে চেয়েছিল। তখন তিনি রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে খেলছিলেন।
গ্রিজমানের জন্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড চেয়েছিল স্প্যানিশ ক্লাবটি। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে না কিনে একই অর্থে গ্রিসের অলিম্পিয়াকোসের স্ট্রাইকার কোস্তাস মিত্রোগ্লুকে দলে নেয় ফুলহাম।

কিন্তু মিত্রোগ্লু প্রিমিয়ার লিগে মাত্র তিন ম্যাচ খেলেন এবং কোনো গোল করতে পারেননি। মৌসুম শেষে অবনমিত হয় ফুলহাম।
অন্যদিকে গ্রিজমান স্পেনেই থেকে যান। আতলেতিকো মাদ্রিদে দুই দফায় নয় মৌসুম এবং বার্সেলোনায় দুই বছর খেলেন তিনি। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এই ফরোয়ার্ড।
ফুটবলে দলবদলের গুঞ্জন সব সময়ই সমর্থকদের নতুন স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু সম্ভাব্য সব চুক্তি বাস্তবায়িত হয় না। কোনো খেলোয়াড়কে না পাওয়ার সিদ্ধান্ত কখনো ক্লাবের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে হাতছাড়া হওয়া তারকা প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন না।
গিফট অরবানের গল্প তাই মনে করিয়ে দেয়- ফুটবলে সম্ভাবনা আর সাফল্যের মধ্যে ব্যবধান অনেক বড়। আর দলবদলের একটি সিদ্ধান্ত কখনো কখনো বদলে দিতে পারে খেলোয়াড় ও ক্লাব- দুজনেরই ভবিষ্যৎ।
সূত্র: বিবিসি স্পোর্টস


































