ঢাকা ০২:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেয়াদোত্তীর্ণ বাসে চলছে পিংক সার্ভিস

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৩৬:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 87

নারীদের জন্য পিংক বাস সার্ভিস শুরু

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে গত ১৮ আগস্ট চালু হওয়া ‘পিংক বাস সার্ভিস’ শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিআরটিসির নথি বলছে, এই সেবায় ব্যবহৃত কয়েকটি বাসের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে সেবাটি প্রতিদিন বড় অঙ্কের লোকসানও দিচ্ছে।

বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, ‘নারায়ণগঞ্জ-ব-১১-০০৮৪’ নম্বরের কোরিয়ান একতলা বাসটি ২০১০-১১ সালে তৈরি। বিআরটিএ ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর এর ফিটনেস সনদ দেয়। আমদানি চুক্তি অনুযায়ী বাসটির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ছিল ১৫ বছর। সেই সময়সীমা শেষ হলেও নতুন রঙ ও মোড়কে বাসটি পিংক বাস সার্ভিসে যুক্ত করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহরের ১৪টি বাসের মধ্যে ৬টির নির্ধারিত ১২ বছরের আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যেই পেরিয়েছে। বাকি ৮টিরও আয়ুষ্কাল শেষ হতে খুব বেশি সময় নেই; সেগুলোর মেয়াদ রয়েছে আরও প্রায় পাঁচ বছর।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, গণপরিবহনের ক্ষেত্রে শুধু ফিটনেস নয়, বাসের আয়ুষ্কালও কঠোরভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তার মতে, আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস দিয়ে তড়িঘড়ি করে সেবা চালু করায় উদ্যোগটি শুরুতেই হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

দুই দিনে লোকসান ১ লাখ ২২ হাজার টাকা

আয়ুষ্কাল নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি পিংক বাস সার্ভিসে বড় অঙ্কের লোকসানের তথ্যও মিলেছে। নথি অনুযায়ী, ২৭ ও ৩০ আগস্ট দেশের ১০টি ডিপো থেকে ১৪টি পিংক বাস মোট ৩০টি ট্রিপ দেয়। ওই দুই দিনে ১ হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয় ২৭ হাজার ৪২ টাকা।

অন্যদিকে জ্বালানি, টোল, বেতনসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে দুই দিনে মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা। গড়ে প্রতিদিন লোকসান প্রায় ৬১ হাজার টাকা।

আয়ুষ্কাল পেরোনোর কথা স্বীকার বিআরটিসির

এ বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা মুঠোফোনে স্বীকার করেন, বহরের কিছু বাস নির্ধারিত আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে।

তিনি বলেন, ২০১৮-১৯ সালের পর বিআরটিসির বহরে নতুন বাস যুক্ত হয়নি। ফলে প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই পুরোনো বাসগুলো চালু রাখা হয়েছে। বৈদ্যুতিক বাস এলে এসব বাস প্রতিস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।

দৈনিক লোকসানের বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান বলেন, সেবাটিকে লাভজনক করার চেষ্টা চলছে। তা সম্ভব না হলে সরকারের কাছে আবারও অর্থ চাওয়া হবে।

তিনি বলেন, পিংক বাস সার্ভিস সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ। তাই নির্দেশনা অনুযায়ী এটি বাস্তবায়ন করা বিআরটিসির দায়িত্ব।

টেকসই করতে রুট পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবাটি টেকসই করতে হলে আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস দ্রুত সরাতে হবে। পাশাপাশি রুট পুনর্বিন্যাস, বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন হলে বেসরকারি বাসকেও এই সেবায় যুক্ত করতে হবে।

মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সরকারি উদ্যোগকে এমনভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত যাতে সেটি বেসরকারি খাতের জন্যও উদাহরণ হয়ে ওঠে। পাইপলাইনে থাকা বৈদ্যুতিক বাস দিয়ে সেবাটি শুরু করা গেলে আয়ুষ্কাল নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠত না।

নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিআরটিসি গত কয়েক দশকে একাধিক উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর বেশিরভাগই দীর্ঘমেয়াদে টেকেনি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া পিংক বাস সার্ভিসও শেষ পর্যন্ত আরেকটি লোকসানি প্রকল্পে পরিণত হতে পারে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মেয়াদোত্তীর্ণ বাসে চলছে পিংক সার্ভিস

সর্বশেষ আপডেট ১১:৩৬:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে গত ১৮ আগস্ট চালু হওয়া ‘পিংক বাস সার্ভিস’ শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিআরটিসির নথি বলছে, এই সেবায় ব্যবহৃত কয়েকটি বাসের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে সেবাটি প্রতিদিন বড় অঙ্কের লোকসানও দিচ্ছে।

বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, ‘নারায়ণগঞ্জ-ব-১১-০০৮৪’ নম্বরের কোরিয়ান একতলা বাসটি ২০১০-১১ সালে তৈরি। বিআরটিএ ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর এর ফিটনেস সনদ দেয়। আমদানি চুক্তি অনুযায়ী বাসটির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ছিল ১৫ বছর। সেই সময়সীমা শেষ হলেও নতুন রঙ ও মোড়কে বাসটি পিংক বাস সার্ভিসে যুক্ত করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহরের ১৪টি বাসের মধ্যে ৬টির নির্ধারিত ১২ বছরের আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যেই পেরিয়েছে। বাকি ৮টিরও আয়ুষ্কাল শেষ হতে খুব বেশি সময় নেই; সেগুলোর মেয়াদ রয়েছে আরও প্রায় পাঁচ বছর।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, গণপরিবহনের ক্ষেত্রে শুধু ফিটনেস নয়, বাসের আয়ুষ্কালও কঠোরভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তার মতে, আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস দিয়ে তড়িঘড়ি করে সেবা চালু করায় উদ্যোগটি শুরুতেই হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

দুই দিনে লোকসান ১ লাখ ২২ হাজার টাকা

আয়ুষ্কাল নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি পিংক বাস সার্ভিসে বড় অঙ্কের লোকসানের তথ্যও মিলেছে। নথি অনুযায়ী, ২৭ ও ৩০ আগস্ট দেশের ১০টি ডিপো থেকে ১৪টি পিংক বাস মোট ৩০টি ট্রিপ দেয়। ওই দুই দিনে ১ হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয় ২৭ হাজার ৪২ টাকা।

অন্যদিকে জ্বালানি, টোল, বেতনসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে দুই দিনে মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা। গড়ে প্রতিদিন লোকসান প্রায় ৬১ হাজার টাকা।

আয়ুষ্কাল পেরোনোর কথা স্বীকার বিআরটিসির

এ বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা মুঠোফোনে স্বীকার করেন, বহরের কিছু বাস নির্ধারিত আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে।

তিনি বলেন, ২০১৮-১৯ সালের পর বিআরটিসির বহরে নতুন বাস যুক্ত হয়নি। ফলে প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই পুরোনো বাসগুলো চালু রাখা হয়েছে। বৈদ্যুতিক বাস এলে এসব বাস প্রতিস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।

দৈনিক লোকসানের বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান বলেন, সেবাটিকে লাভজনক করার চেষ্টা চলছে। তা সম্ভব না হলে সরকারের কাছে আবারও অর্থ চাওয়া হবে।

তিনি বলেন, পিংক বাস সার্ভিস সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ। তাই নির্দেশনা অনুযায়ী এটি বাস্তবায়ন করা বিআরটিসির দায়িত্ব।

টেকসই করতে রুট পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবাটি টেকসই করতে হলে আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস দ্রুত সরাতে হবে। পাশাপাশি রুট পুনর্বিন্যাস, বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন হলে বেসরকারি বাসকেও এই সেবায় যুক্ত করতে হবে।

মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সরকারি উদ্যোগকে এমনভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত যাতে সেটি বেসরকারি খাতের জন্যও উদাহরণ হয়ে ওঠে। পাইপলাইনে থাকা বৈদ্যুতিক বাস দিয়ে সেবাটি শুরু করা গেলে আয়ুষ্কাল নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠত না।

নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিআরটিসি গত কয়েক দশকে একাধিক উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর বেশিরভাগই দীর্ঘমেয়াদে টেকেনি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া পিংক বাস সার্ভিসও শেষ পর্যন্ত আরেকটি লোকসানি প্রকল্পে পরিণত হতে পারে।