ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির নেপথ্যে কী?

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:১২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 123

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির নেপথ্যে কী?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কায় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি তাৎপর্য নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, হঠাৎ করেই এই তিন দেশ এ ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। তারই ধারাবাহিকতায় এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে।

চুক্তিটি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।

তবে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক; দুই ধরনের মতই পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হলে সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক; দুই দিক থেকেই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।

গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট চলছে। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এমন অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। কেননা, এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সব দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা প্যাক্ট।

এই জোট গঠনের অন্যতম লক্ষ্য হলো; চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ, এই চুক্তি বা জোটভুক্ত দেশগুলো নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগাবে।

চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একই সঙ্গে চুক্তিতে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও এর বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে কোনো একটি দেশ বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে, তা চুক্তিতে নির্ধারিত হয়নি।

এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশগুলোর এগিয়ে আসার বিষয়টিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে ‘কার্যত একই’ বলে বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, যতক্ষণ না এটি বাস্তবে পরীক্ষিত হচ্ছে; উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবের ওপর কোনো হামলার জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়; ততক্ষণ পর্যন্ত এই চুক্তিকে বাধ্যতামূলক ন্যাটো-ধাঁচের অঙ্গীকারের পরিবর্তে একটি ‘অভিপ্রায়ের ঘোষণা’ হিসেবে দেখা উচিত।

চলতি বছরের ১৯ মার্চ ইসলামি সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি কেমন হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট মক্কায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই চুক্তি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু এই তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং আরও বিস্তৃত হওয়া এবং সম্ভব হলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একদিন এই অঞ্চলের সব দেশ এই ছাতার নিচে একত্রিত হতে পারে।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণ কী?

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং দুই অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক। হঠাৎ কেন এই তিন দেশ এমন একটি চুক্তিতে যুক্ত হলো, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে নানা উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষ করে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখলে নিয়েছে। এদিকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি সৌদি আরব এবং পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সেদিক থেকে তিন দেশ একে অপরের পরিপূরক।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ইরান কিংবা হুথিদের মতো বিদ্রোহীরা। এই জটিলতা শেষ না হলে হুথি সমস্যা শেষ হবে না। সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ইসরায়েলকে ধরা হয়। সেই দিক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে একসঙ্গে পাওয়া তুরস্কের জন্যও লাভজনক বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, সৌদি আরবের অর্থ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ও অভিজ্ঞতা এবং তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের দক্ষতা; এই তিনটি সক্ষমতা একত্রিত হলে তা তাদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে দেশগুলো মনে করেছে।

ধর্মীয় দিক থেকেও এই চুক্তির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, মুসলিম দেশগুলোর কাছে চুক্তিটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে শুক্রবারকে দিন এবং মক্কাকে স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ কেন যুক্ত হতে চায়?

আগস্টের শুরুতে তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে গত সপ্তাহে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এর জবাব দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে তিনি এই জোটে বা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান।

কবির বলেন, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মধ্যপ্রাচ্যে যদি এমনও হয় যে ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তি হয়, তাহলে সেখানে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা খুব একটা শক্তিশালী নয়। সেদিক থেকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি এবং তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল রয়েছে। ওই তিন দেশের সঙ্গে একসঙ্গে থাকলে বাংলাদেশই উপকৃত হবে বলে মনে করেন তিনি।

অধ্যাপক খান বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশ যেহেতু রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বাংলাদেশ মনে করছে।

যদিও ইতিবাচক দিক যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে প্রতিবেশী দেশ ভারত বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। এক দিক থেকে এটি বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে; ভারত নিজেকে অনিরাপদ মনে করতে পারে। তখন তারা ইসরায়েলের শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে ভারতকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি যুদ্ধ ও প্রক্সি বাহিনীর সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। ফলে চুক্তিতে যুক্ত হলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না যুক্ত হলেও অন্য ধরনের ঝুঁকি থাকবে।

মিসরও অনানুষ্ঠানিক এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিসর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতও রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির নেপথ্যে কী?

সর্বশেষ আপডেট ০২:১২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কায় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি তাৎপর্য নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, হঠাৎ করেই এই তিন দেশ এ ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। তারই ধারাবাহিকতায় এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে।

চুক্তিটি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।

তবে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক; দুই ধরনের মতই পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হলে সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক; দুই দিক থেকেই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।

গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট চলছে। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এমন অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। কেননা, এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সব দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা প্যাক্ট।

এই জোট গঠনের অন্যতম লক্ষ্য হলো; চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ, এই চুক্তি বা জোটভুক্ত দেশগুলো নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগাবে।

চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একই সঙ্গে চুক্তিতে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও এর বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে কোনো একটি দেশ বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে, তা চুক্তিতে নির্ধারিত হয়নি।

এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশগুলোর এগিয়ে আসার বিষয়টিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে ‘কার্যত একই’ বলে বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, যতক্ষণ না এটি বাস্তবে পরীক্ষিত হচ্ছে; উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবের ওপর কোনো হামলার জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়; ততক্ষণ পর্যন্ত এই চুক্তিকে বাধ্যতামূলক ন্যাটো-ধাঁচের অঙ্গীকারের পরিবর্তে একটি ‘অভিপ্রায়ের ঘোষণা’ হিসেবে দেখা উচিত।

চলতি বছরের ১৯ মার্চ ইসলামি সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি কেমন হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট মক্কায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই চুক্তি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু এই তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং আরও বিস্তৃত হওয়া এবং সম্ভব হলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একদিন এই অঞ্চলের সব দেশ এই ছাতার নিচে একত্রিত হতে পারে।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণ কী?

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং দুই অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক। হঠাৎ কেন এই তিন দেশ এমন একটি চুক্তিতে যুক্ত হলো, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে নানা উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষ করে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখলে নিয়েছে। এদিকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি সৌদি আরব এবং পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সেদিক থেকে তিন দেশ একে অপরের পরিপূরক।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ইরান কিংবা হুথিদের মতো বিদ্রোহীরা। এই জটিলতা শেষ না হলে হুথি সমস্যা শেষ হবে না। সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ইসরায়েলকে ধরা হয়। সেই দিক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে একসঙ্গে পাওয়া তুরস্কের জন্যও লাভজনক বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, সৌদি আরবের অর্থ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ও অভিজ্ঞতা এবং তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের দক্ষতা; এই তিনটি সক্ষমতা একত্রিত হলে তা তাদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে দেশগুলো মনে করেছে।

ধর্মীয় দিক থেকেও এই চুক্তির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, মুসলিম দেশগুলোর কাছে চুক্তিটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে শুক্রবারকে দিন এবং মক্কাকে স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ কেন যুক্ত হতে চায়?

আগস্টের শুরুতে তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে গত সপ্তাহে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এর জবাব দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে তিনি এই জোটে বা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান।

কবির বলেন, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মধ্যপ্রাচ্যে যদি এমনও হয় যে ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তি হয়, তাহলে সেখানে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা খুব একটা শক্তিশালী নয়। সেদিক থেকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি এবং তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল রয়েছে। ওই তিন দেশের সঙ্গে একসঙ্গে থাকলে বাংলাদেশই উপকৃত হবে বলে মনে করেন তিনি।

অধ্যাপক খান বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশ যেহেতু রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বাংলাদেশ মনে করছে।

যদিও ইতিবাচক দিক যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে প্রতিবেশী দেশ ভারত বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। এক দিক থেকে এটি বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে; ভারত নিজেকে অনিরাপদ মনে করতে পারে। তখন তারা ইসরায়েলের শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে ভারতকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি যুদ্ধ ও প্রক্সি বাহিনীর সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। ফলে চুক্তিতে যুক্ত হলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না যুক্ত হলেও অন্য ধরনের ঝুঁকি থাকবে।

মিসরও অনানুষ্ঠানিক এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিসর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতও রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা