ঢাকা ০২:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদ্মায় বিলীন পূর্বপুরুষের কবরও, শেষ স্মৃতিটুকু হারাল পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক, মানিকগঞ্জ
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৫০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 61

পদ্মায় বিলীন পূর্বপুরুষের কবরও, শেষ স্মৃতিটুকু হারাল পরিবার

‘বাড়িঘর, জমিজমা পদ্মা গিলে খেয়েছে। এবার আমাদের পূর্বপুরুষের কবরটিও পদ্মা নদী গিলে খেল।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া এলাকার মোহাম্মদ রাজিব হোসেন।

পদ্মার তীব্র ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমির পর এবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে রাজিবের দাদা মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবর। প্রায় দেড় যুগ ধরে পরিবারের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কবরটি দুই দিন আগে নদীর স্রোতে হারিয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলে কয়েক বছর ধরেই পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে লেছড়াগঞ্জ, আজিমনগর ও সুতালড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এ বছরও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া, সেলিমপুর, জয়পুর ও হালুয়াঘাট এলাকায় ভাঙনে শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

গত চার-পাঁচ বছরে চরাঞ্চলের সুতালড়ি ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন, আজিমনগর ইউনিয়নের চারতলা আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, চরাঞ্চলের একমাত্র হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাজারসহ হাজার হাজার বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।

চরাঞ্চলে কৃষি নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বারসিকের মাঠ কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন বলেন, সেলিমপুর গত বছরই পদ্মায় বিলীন হয়েছে। চলতি বর্ষায় জয়পুরের শতাধিক বাড়ি নদীতে চলে গেছে। মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। আগে যাদের জমিজমা ছিল, তাদের অনেকেই এখন থাকার জায়গা হারিয়েছেন। লেছড়াগঞ্জের পাশাপাশি ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নেও ভাঙন শুরু হয়েছে।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো শাকিল মিয়া বলেন, তাদের ঘরবাড়ি ও জমি কয়েকবার নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন আবার চরাঞ্চলে ভাঙন শুরু হয়েছে। হড়িনা ঘাট এলাকাতেও ভাঙন চলছে। তবে ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

আজিমনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ নাসির হোসেন জানান, কয়েক বছরে হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের চারতলা ভবনসহ অনেক স্থাপনা নদীগর্ভে চলে গেছে।

সুতালড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য সোলাইমান হোসেন সুরমান বলেন, কয়েক বছর আগে রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নদীতে বিলীন হয়েছে। পুরো ইউনিয়নই ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বছর লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে ভাঙন সবচেয়ে বেশি। দ্রুত বালুভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানো না গেলে চরাঞ্চলের অস্তিত্বও হুমকিতে পড়বে।

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য মোতালেব হোসেন বলেন, সাবেক বিমানমন্ত্রী ও বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা দায়িত্বে থাকাকালে সেলিমপুর-হরিহরদিয়া এলাকায় ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তার ভাষায়, ‘আমাদের চর শেষ হয়ে গেল।’

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, চরের মানুষ কোথায় যাবে? লেছড়াগঞ্জসহ পুরো চরাঞ্চলই পদ্মার ভাঙনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো কাজ নেওয়া হচ্ছে না।

আন্ধারমানিক ঘাট থেকে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে চলাচলকারী ট্রলারের চালক আবুল হাশেম বলেন, লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নটাখোলা পুলিশ ফাঁড়ি ও নটাখোলা আফরোজা উচ্চ বিদ্যালয়ও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। সেলিমপুর গত বর্ষায় বিলীন হয়েছে, এবার জয়পুরও শেষের পথে। হালুয়াঘাট এলাকাতেও ভাঙন চলছে।

হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, তিনি সম্প্রতি এ উপজেলায় যোগ দিয়েছেন। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাকে নদীভাঙনের বিষয়টি জানিয়েছেন। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, সোমবার মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করবেন। পরিদর্শনের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

পদ্মায় বিলীন পূর্বপুরুষের কবরও, শেষ স্মৃতিটুকু হারাল পরিবার

সর্বশেষ আপডেট ০১:৫০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘বাড়িঘর, জমিজমা পদ্মা গিলে খেয়েছে। এবার আমাদের পূর্বপুরুষের কবরটিও পদ্মা নদী গিলে খেল।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া এলাকার মোহাম্মদ রাজিব হোসেন।

পদ্মার তীব্র ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমির পর এবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে রাজিবের দাদা মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবর। প্রায় দেড় যুগ ধরে পরিবারের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কবরটি দুই দিন আগে নদীর স্রোতে হারিয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলে কয়েক বছর ধরেই পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে লেছড়াগঞ্জ, আজিমনগর ও সুতালড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এ বছরও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া, সেলিমপুর, জয়পুর ও হালুয়াঘাট এলাকায় ভাঙনে শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

গত চার-পাঁচ বছরে চরাঞ্চলের সুতালড়ি ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন, আজিমনগর ইউনিয়নের চারতলা আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, চরাঞ্চলের একমাত্র হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাজারসহ হাজার হাজার বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।

চরাঞ্চলে কৃষি নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বারসিকের মাঠ কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন বলেন, সেলিমপুর গত বছরই পদ্মায় বিলীন হয়েছে। চলতি বর্ষায় জয়পুরের শতাধিক বাড়ি নদীতে চলে গেছে। মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। আগে যাদের জমিজমা ছিল, তাদের অনেকেই এখন থাকার জায়গা হারিয়েছেন। লেছড়াগঞ্জের পাশাপাশি ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নেও ভাঙন শুরু হয়েছে।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো শাকিল মিয়া বলেন, তাদের ঘরবাড়ি ও জমি কয়েকবার নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন আবার চরাঞ্চলে ভাঙন শুরু হয়েছে। হড়িনা ঘাট এলাকাতেও ভাঙন চলছে। তবে ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

আজিমনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ নাসির হোসেন জানান, কয়েক বছরে হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের চারতলা ভবনসহ অনেক স্থাপনা নদীগর্ভে চলে গেছে।

সুতালড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য সোলাইমান হোসেন সুরমান বলেন, কয়েক বছর আগে রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নদীতে বিলীন হয়েছে। পুরো ইউনিয়নই ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বছর লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে ভাঙন সবচেয়ে বেশি। দ্রুত বালুভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানো না গেলে চরাঞ্চলের অস্তিত্বও হুমকিতে পড়বে।

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য মোতালেব হোসেন বলেন, সাবেক বিমানমন্ত্রী ও বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা দায়িত্বে থাকাকালে সেলিমপুর-হরিহরদিয়া এলাকায় ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তার ভাষায়, ‘আমাদের চর শেষ হয়ে গেল।’

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, চরের মানুষ কোথায় যাবে? লেছড়াগঞ্জসহ পুরো চরাঞ্চলই পদ্মার ভাঙনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো কাজ নেওয়া হচ্ছে না।

আন্ধারমানিক ঘাট থেকে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে চলাচলকারী ট্রলারের চালক আবুল হাশেম বলেন, লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নটাখোলা পুলিশ ফাঁড়ি ও নটাখোলা আফরোজা উচ্চ বিদ্যালয়ও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। সেলিমপুর গত বর্ষায় বিলীন হয়েছে, এবার জয়পুরও শেষের পথে। হালুয়াঘাট এলাকাতেও ভাঙন চলছে।

হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, তিনি সম্প্রতি এ উপজেলায় যোগ দিয়েছেন। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাকে নদীভাঙনের বিষয়টি জানিয়েছেন। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, সোমবার মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করবেন। পরিদর্শনের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।