নোনা পানি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির মরণফাঁদে শৈশব!
- সর্বশেষ আপডেট ০২:৩০:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 82
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিশাপ কেবল সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ানো বা ফসলের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কিশোরীদের জরায়ু ও মস্তিষ্কেও। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিয়েছে। নোনা পানির প্রভাবে সৃষ্ট পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবজনিত জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী শিক্ষার্থীরা গণহারে সেবন করছে ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি’ (Contraceptive Pills), যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রজননক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রজননস্বাস্থ্যের জন্যই শুধু হুমকিস্বরূপ নয়, পিরিয়ড বন্ধে এবং পিরিয়ড নিয়মিতকরণে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনে শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’ সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরা ইউনিয়নের প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন একই চিত্র। সরেজমিনে দেখা গেছে, কিশোরীরা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরপরই ঋতুস্রাবের অনিয়ম বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণের শিকার হচ্ছে। এর প্রধান কারণ; লবণাক্ত পানি। স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সামর্থ্য না থাকায় এসব কিশোরী পিরিয়ডের সময় কাপড় ব্যবহার করে এবং সেই কাপড় ধুতে হয় নোনা পানিতে।
বুড়িগোয়ালিনী-গাবুরা বিজি কলেজের শিক্ষার্থী মোসাম্মৎ সানজিদা খানম (১৮)। তিনি জানান, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার পিরিয়ড শুরু হয়। সে সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতেন না। পিরিয়ডের সময় ব্যবহৃত কাপড় লবণাক্ত পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে ওই কাপড় ব্যবহার করায় নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার পিরিয়ডে সমস্যা দেখা দেয়। প্রতি মাসে নিয়মিত পিরিয়ড হয় না। কখনো দুই-তিন মাস পর হয়, আবার কখনো মাসে দুই-তিনবার হয়। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটানা এক মাস পিরিয়ড ছিল। পরে মা তাকে গাইনি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।
সানজিদা বলেন, ‘গাইনি চিকিৎসক আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিন মাস জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনের পরামর্শ দেন, যাতে পিরিয়ড নিয়মিত হয়। চিকিৎসক বলেছেন, এটি সেবন করলে পিরিয়ড নিয়মিত হবে। কিন্তু এটি সেবনে শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করি। মাথা ঘোরে। কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করে না। বিষয়টি চিকিৎসককে জানালে তিনি শরীরের যত্ন নিতে এবং ডিম-দুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। এটি সেবনে পিরিয়ড মাঝেমধ্যে ঠিক হলেও কিছুদিন পর আবার একই সমস্যা দেখা দেয়। এবারও মা আমাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। তিনিও জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করতে দেন।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা পিরিয়ড ‘বন্ধ রাখতে’ বা ‘নিয়মিত করতে’ নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাচ্ছে। ১২ বছর বয়সী রিমা আক্তার বা ১৩ বছরের আছিয়া আক্তারের মতো অসংখ্য কিশোরী এই ওষুধ সেবনের পর পেটব্যথা, প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যায় ভুগছে।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী এই প্রবণতাকে ‘মারাত্মক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘২৫ বছরের আগে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করা উচিত নয়। এটি কিশোরীদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি (Growth) ব্যাহত করে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের অক্ষমতা তৈরি করতে পারে। এমনকি এটি তাদের মস্তিষ্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পিরিয়ড একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। এটি বন্ধ রাখা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর ফলে পিরিয়ড অনিয়মিত হয়ে যায়। হরমোনজনিত সমস্যা দেখা দেয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের মধ্যে যারা না বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করে, তাদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কোনোভাবেই এটি সেবন করে নিজের সুবিধার্থে পিরিয়ড বন্ধ রাখা যাবে না।’
আশ্চর্যের বিষয় হলো, তৃণমূল পর্যায়ে এই সংকট প্রকট হলেও জেলা বা উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাছে এর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তারাও এই ভয়াবহতা সম্পর্কে অনেকটা অন্ধকারে। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম এবং পরিবার পরিকল্পনা উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদ উভয়েই জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কিশোরীদের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাওয়ার বিষয়টি তাদের নথিতে নেই।
শ্যামনগরে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুমানা চৌধুরী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে পিরিয়ডের জটিলতা নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী আসে। তবে কতজন এ সমস্যায় আক্রান্ত, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’
তথ্যের এই শূন্যতা প্রমাণ করে যে, উপকূলীয় নারী স্বাস্থ্য এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের রাডারে পৌঁছাতে পারেনি।
নারীপক্ষের মতো কিছু বেসরকারি সংস্থা এবং ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর মতো সংগঠনগুলো এখন এলাকাভিত্তিক ক্যাম্পেইন ও সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করেছে। নারীপক্ষের প্রকল্প পরিচালক সামিয়া আফরীন জানান, শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবকদেরও এই বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে মায়েরাই মেয়েদের এই বড়ি সেবনে উৎসাহিত করছেন।
দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্রমণ, পরীক্ষা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দোহাই দিয়ে পিরিয়ড বন্ধ রাখা যে স্বাস্থ্যের জন্য কতটা আত্মঘাতী, তা প্রচার করা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এসব কিশোরীর প্রজননস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে কেবল ওষুধ বিতরণ নয়, বরং নোনা জলের বিকল্প ব্যবস্থা এবং নিরাপদ ঋতুস্রাব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি গোটা প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ধাবিত হতে পারে।
































