রাজধানীতে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৮:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
- / 352
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বৃদ্ধি ছাড়া গণতান্ত্রিক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তারা বলেন, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সময়ের দাবি। রবিবার (১৫ মার্চ) জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ- বিএনপিএস আয়োজিত ‘নারীর সমানাধিকার: বৈষম্য নিরসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ইউএন ওমেন এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পার হলেও বিশ্বের কোনো দেশ নারী ও পুরুষের মধ্যে আইনগত বৈষম্য পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে মাত্র ৬৪ শতাংশ আইনগত অধিকার ভোগ করছেন। কাজ, আয়, নিরাপত্তা, পরিবার, সম্পত্তি, চলাচল, ব্যবসা ও অবসরজীবন- এসব মৌলিক ক্ষেত্রেও অনেক সময় আইন ও সামাজিক চর্চা নারীর বিরুদ্ধে কাজ করে। কোথাও আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই, আবার কোথাও ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতি ও ভ্রান্ত ধারণা নারীর অধিকার অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান গতিতে অগ্রগতি চলতে থাকলে নারী-পুরুষের মধ্যে আইনগত সুরক্ষার ব্যবধান দূর হতে আরও প্রায় ২৮৬ বছর সময় লাগতে পারে।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ওই নির্বাচনে মোট ২০২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮৭ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন মাত্র সাতজন। মন্ত্রিসভায়ও নারীর সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে বিএনপিএসের পরিচালক শাহনাজ সুমি বলেন, দেশে এখনো নারীরা কাঠামোগত বৈষম্য, সহিংসতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে শুধু আইনি স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়; বরং তা বাস্তব জীবনে কার্যকর করতে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, কার্যকর নীতি এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বৈঠকে বক্তব্য দেন ড. তানিয়া হক, অধ্যাপক আইনুন নাহার, ফাতেমা ফেরদৌসি, অর্চনা সাহা, দীপ্তি সিকদার, আফসানা বিনতে আমিন, ফরিদা বেগম, সেলিনা আক্তার, রিয়া চাকমা, মুশফিকা লাইজু ও মেহেরুন্নেসা প্রমুখ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার সঠিক বিচার ও প্রতিরোধ না হওয়ায় সমাজে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এতে শুধু নারী নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি পরিবার থেকেই জেন্ডার-সংবেদনশীল মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আইনুন নাহার বলেন, সংবিধানে নারীর সমানাধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে নারীর ক্ষমতায়নে কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে রাষ্ট্র পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়নি। সমান মজুরি নিশ্চিত না হওয়া, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব, বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ নারীর পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতায়নের পথে বড় বাধা।
তিনি আরও বলেন, কৃষি ও মৎস্য খাতে অনেক নারী কাজ করলেও তাদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। এসব বৈষম্য দূর করতে আইন বাস্তবায়ন ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড বিভাগের আইনজীবী দীপ্তি সিকদার বলেন, সহিংসতার শিকার হলে শুধু ভুক্তভোগী নারী নয়, তার পরিবারও নানা ধরনের সামাজিক হয়রানির শিকার হয়। তাই সমাজে এমন মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নির্যাতন করা হবে না এবং নির্যাতন সহ্যও করা হবে না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন, গ্রামীণ নারী, শ্রমজীবী নারী, প্রতিবন্ধী নারী, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীরা বহুমাত্রিক বৈষম্যের মুখোমুখি হন। তাদের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নারী ও মেয়েদের জন্য বৈষম্যহীন, নিরাপদ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।






























