ধর্মীয় পরিচয়ের বিরোধে থমকে আছে শুভর শেষযাত্রা
- সর্বশেষ আপডেট ০২:২৬:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 58
নারায়ণগঞ্জে গুলিতে নিহত শুভ (৩০) ওরফে বিল্লালের মরদেহ সাত দিনেও দাফন বা সৎকার করা সম্ভব হয়নি। নিহতের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার ভিন্ন দাবির কারণে তার শেষযাত্রা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানোর পর মরদেহ হিমাগারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে গুলি করে হত্যা করা হয় শুভকে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উদঘাটনের দাবি করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সুমন (৪৫), সিয়াম আহমেদ সিজান (২১) ও সোহান (২৪) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তবে হত্যার তদন্তে অগ্রগতি হলেও শুভর শেষকৃত্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। নিহতের মা দাবি করছেন, শুভ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাকে মুসলিম রীতিতে দাফন করতে চান তিনি। অন্যদিকে বাবা হরি চন্দ্র দাসের দাবি, শুভ হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন। তাই তিনি ছেলের মরদেহ হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করতে চান।
বাবা-মায়ের এই বিরোধের কারণে বিষয়টি আদালতে ওঠে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) শুনানি শেষে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদার আদালত মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। পরে আদালত পুলিশের পরিদর্শক আবদুস সামাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শুভর মা জানান, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তার ছেলে ‘বিল্লাল’ নাম নেন। পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সময় ২০০৩ সালে শুভর বয়স ছিল চার বছর। এরপর তার মা, শুভ, তার ছোট ভাই ও বোন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
শুভর ভাই ইব্রাহিম বলেন, তারা দুই ভাই একসঙ্গে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে তাদের সুন্নতে খাতনা হয় এবং নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার রওজাতুস সালেহীন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। শুভ মুসলিম রীতিতে কাবিনের মাধ্যমে বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী জুথি মুসলিম এবং তাদের দুই সন্তান রয়েছে।
শুভ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুর রহমান বলেন, শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস ও মা আয়েশা বেগমের ২০০৩ সালে তালাক হয়। তালাকের সময় শুভর বয়স ছিল চার বছর। এরপর তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শুভ এফিডেভিটের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘বিল্লাল’ নাম নেন এবং মুসলিম রীতি অনুযায়ী বিয়ে করেন।
তবে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস ছেলের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ভিন্ন দাবি করছেন। তার ভাষ্য, শুভ হিন্দু ধর্মে জন্মেছেন। তাই তিনি ছেলের মরদেহ হিন্দু রীতি অনুযায়ী দাহ করতে চান।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি সাজেদুর রহমান বলেন, শুভ হিন্দু না মুসলিম—এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত মরদেহ হিমাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি গুলির খোসা এবং শুভর মরদেহের পাশ থেকে ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। পুলিশের দাবি, ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেটের বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীর মাধ্যমে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। পরে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। নিহত শুভর বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পারিবারিক বিরোধের কারণে হত্যার ছয় দিন পরও শুভর মরদেহের শেষযাত্রা হয়নি। আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মরদেহটি আপাতত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে।































