ঢাকা ০১:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন মাস বন্ধের পরও সুন্দরবনে প্লাস্টিকের স্তূপ

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩১:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 102

তিন মাস বন্ধের পরও সুন্দরবনে প্লাস্টিকের স্তূপ

বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুমে টানা তিন মাস পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ থাকার পরও সুন্দরবনে কমেনি প্লাস্টিক দূষণ। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই বনের বিভিন্ন নদী, খাল ও সৈকতে জমেছে বিপুল পরিমাণ পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কর্কশিটসহ নানা ধরনের বর্জ্য।

৬ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের কটকা, কচিখালি, জামতলা, ডিমের চর ও আন্ধারমানিকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে। সৈকত থেকে শুরু করে বনের অভ্যন্তর পর্যন্ত কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, আবার কোথাও স্তূপ আকারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে প্লাস্টিক বর্জ্য। কসমেটিকসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, বিভিন্ন পণ্যের বোতল, কর্কশিট ও পানিতে ভাসমান ছোট প্লাস্টিকের ড্রামসহ নানা ধরনের সামগ্রী পড়ে আছে।

গত মঙ্গলবার ডিমের চরে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সাগরের তীরসংলগ্ন উঁচু জায়গাগুলোতে কয়েক টন প্লাস্টিক বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। কটকা ও কচিখালি থেকেও এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক অপসারণ করা হয়েছে। জামতলার প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পথ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলেও সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রচুর বর্জ্য দেখা গেছে।

জোয়ার-ভাটার স্রোতে উপকূলীয় নদী-খাল থেকে ভেসে আসা বর্জ্য যেমন সুন্দরবনে জমছে, তেমনি সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া নৌযান থেকে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকও স্রোতের সঙ্গে বনের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এ সময়ে সব ধরনের নৌযান চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। তবে এই তিন মাসের বিরতির পরও বনের বিভিন্ন এলাকায় প্লাস্টিকের স্তূপ দেখা যাচ্ছে।

পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে ৭, ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের পাঁচটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায় ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস)। তিন দিনের অভিযানে সংগঠনটির সদস্যরা ১৫ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে খুলনায় নিয়ে ডাম্পিং করেন। এর আগে গত মে মাসেও একই পাঁচ পর্যটনকেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে ১২ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

টোয়াসের সদস্যদের ভাষ্য, এবার বর্জ্যের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনের প্লাস্টিক দূষণের দায় শুধু পর্যটকদের ওপর চাপালে সমস্যার মূল উৎস আড়ালেই থেকে যাবে। উপকূলীয় জনপদে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী-খালে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা এবং সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান থেকে বর্জ্য ফেলার প্রবণতাও এ দূষণের বড় কারণ।

সুন্দরবনের সীমানা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া পশুর, শিবসা, কপোতাক্ষ, শেলা, বলেশ্বর, খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও চুনকুড়িসহ বিভিন্ন নদী এসব বর্জ্য বহনের অন্যতম পথ হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় বাজার, মাছের আড়ত, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বসতবাড়ির আশপাশে ফেলে রাখা প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-খালে গিয়ে পড়ছে। পরে জোয়ারের পানিতে তা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের মোংলা, চাঁদপাই, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ ও রামপাল; খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও কৈখালীর বিভিন্ন বাজার ও বসতবাড়ির আশপাশ থেকেও প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে।

উপকূলের বাসিন্দারা জানান, কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠান, খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দ্রুত সেবা দিতে এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। ব্যবহারের পর অনেক ক্ষেত্রেই প্লাস্টিক খাল, জলাশয় কিংবা নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের মৎস্যজীবী সোলায়মান শেখ ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মাছ শিকার করেন। তিনি বলেন, আগে চরের ওপর আগাছা বা ছোট গাছ জন্মানোর সুযোগ থাকলেও এখন অনেক জায়গা প্লাস্টিকে ভরে থাকায় আগের মতো গাছ জন্মায় না।

তিনি বলেন, তাঁরা নিজেরা প্লাস্টিক না ফেলার চেষ্টা করেন। তবে ঘাট বা নৌযানে ডাস্টবিন না থাকায় ব্যবহৃত পানির বোতল কিংবা খাবারের প্যাকেট রাখারও নির্দিষ্ট জায়গা নেই। অনেক সময় এসব বর্জ্য নৌকায় করে লোকালয়ে এনে মাটিতে পুঁতে ফেলেন বলে জানান তিনি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, প্লাস্টিক দূষণের কারণে সুন্দরবনের গাছপালা, জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানত তিনটি উৎস থেকে সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ হচ্ছে; আপস্ট্রিম সোর্স, জেলে ও পর্যটক এবং অননুমোদিত চলাচল। আপস্ট্রিম নদীগুলো থেকে প্লাস্টিকের প্রবাহ কমানো গেলে দূষণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, প্লাস্টিক দূষণের কারণে সামুদ্রিক প্রাণী, বনজ বাস্তুতন্ত্র ও গাছপালার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বীজের অঙ্কুরোদগমের হারও কমে যায়। তাঁর গবেষণাতেও এসব প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তাঁর ভাষ্য, যেকোনোভাবে প্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে তা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। গণসচেতনতা ছাড়া প্লাস্টিকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়।

সুন্দরবনের পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্লাস্টিক দূষণের জন্য শুধু পর্যটকদের দায়ী করলে সমস্যার বড় একটি অংশ অমীমাংসিত থেকে যাবে। উপকূলীয় এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও ব্যবসায়ীদেরও সচেতন করতে হবে।

টোয়াসের সহসভাপতি মাঝহারুল হক কচি বলেন, তাঁরাও সুন্দরবনকে নিরাপদ রাখতে চান, কারণ তাঁদের ব্যবসাও এই বনের ওপর নির্ভরশীল। নিজেদের উদ্যোগে নদী পরিষ্কার অভিযান চালানোর পাশাপাশি পর্যটকদের সচেতন করার চেষ্টা করেন তাঁরা। তবে সরকার ও বন বিভাগের অংশগ্রহণ ছাড়া বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ করলেই হবে না, জাহাজে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে পর্যটকদের কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। মৌসুমের শুরু ও শেষে দুই দফায় টোয়াসের সদস্যরা প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহ করে খুলনায় নিয়ে ডাম্পিং করেন। এবার বর্জ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়ে এ কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবার ভ্রমণের সময় সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে জাহাজ থেকেও বর্জ্য অপসারণ করবেন বলে জানান তিনি।

বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক বহন করে নেওয়া কিংবা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বন প্রহরীরা নিয়মিত টহল ও তল্লাশি চালালেও নদীপথে ভেসে আসা বর্জ্য ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক নেওয়া বা ফেলা নিষিদ্ধ। বন প্রহরীরা নিয়মিত টহল দিয়ে পর্যটক ও জেলেদের তল্লাশি করেন। এরপরও নদীপথে ভেসে আসা প্লাস্টিক সুন্দরবনের নদী-খালে পৌঁছে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এই সমস্যা শুধু বন বিভাগ বা টোয়াসের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিতভাবে সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। বন বিভাগ বছরে কয়েকবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পাশাপাশি স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক সভা করে। তবে এই দূষণ ঠেকাতে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা।

সূত্র: ডেইলি স্টার

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

তিন মাস বন্ধের পরও সুন্দরবনে প্লাস্টিকের স্তূপ

সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩১:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুমে টানা তিন মাস পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ থাকার পরও সুন্দরবনে কমেনি প্লাস্টিক দূষণ। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই বনের বিভিন্ন নদী, খাল ও সৈকতে জমেছে বিপুল পরিমাণ পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কর্কশিটসহ নানা ধরনের বর্জ্য।

৬ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের কটকা, কচিখালি, জামতলা, ডিমের চর ও আন্ধারমানিকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে। সৈকত থেকে শুরু করে বনের অভ্যন্তর পর্যন্ত কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, আবার কোথাও স্তূপ আকারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে প্লাস্টিক বর্জ্য। কসমেটিকসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, বিভিন্ন পণ্যের বোতল, কর্কশিট ও পানিতে ভাসমান ছোট প্লাস্টিকের ড্রামসহ নানা ধরনের সামগ্রী পড়ে আছে।

গত মঙ্গলবার ডিমের চরে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সাগরের তীরসংলগ্ন উঁচু জায়গাগুলোতে কয়েক টন প্লাস্টিক বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। কটকা ও কচিখালি থেকেও এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক অপসারণ করা হয়েছে। জামতলার প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পথ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলেও সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রচুর বর্জ্য দেখা গেছে।

জোয়ার-ভাটার স্রোতে উপকূলীয় নদী-খাল থেকে ভেসে আসা বর্জ্য যেমন সুন্দরবনে জমছে, তেমনি সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া নৌযান থেকে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকও স্রোতের সঙ্গে বনের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এ সময়ে সব ধরনের নৌযান চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। তবে এই তিন মাসের বিরতির পরও বনের বিভিন্ন এলাকায় প্লাস্টিকের স্তূপ দেখা যাচ্ছে।

পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে ৭, ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের পাঁচটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায় ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস)। তিন দিনের অভিযানে সংগঠনটির সদস্যরা ১৫ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে খুলনায় নিয়ে ডাম্পিং করেন। এর আগে গত মে মাসেও একই পাঁচ পর্যটনকেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে ১২ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

টোয়াসের সদস্যদের ভাষ্য, এবার বর্জ্যের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনের প্লাস্টিক দূষণের দায় শুধু পর্যটকদের ওপর চাপালে সমস্যার মূল উৎস আড়ালেই থেকে যাবে। উপকূলীয় জনপদে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী-খালে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা এবং সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান থেকে বর্জ্য ফেলার প্রবণতাও এ দূষণের বড় কারণ।

সুন্দরবনের সীমানা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া পশুর, শিবসা, কপোতাক্ষ, শেলা, বলেশ্বর, খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও চুনকুড়িসহ বিভিন্ন নদী এসব বর্জ্য বহনের অন্যতম পথ হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় বাজার, মাছের আড়ত, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বসতবাড়ির আশপাশে ফেলে রাখা প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-খালে গিয়ে পড়ছে। পরে জোয়ারের পানিতে তা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের মোংলা, চাঁদপাই, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ ও রামপাল; খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও কৈখালীর বিভিন্ন বাজার ও বসতবাড়ির আশপাশ থেকেও প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে।

উপকূলের বাসিন্দারা জানান, কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠান, খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দ্রুত সেবা দিতে এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। ব্যবহারের পর অনেক ক্ষেত্রেই প্লাস্টিক খাল, জলাশয় কিংবা নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের মৎস্যজীবী সোলায়মান শেখ ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মাছ শিকার করেন। তিনি বলেন, আগে চরের ওপর আগাছা বা ছোট গাছ জন্মানোর সুযোগ থাকলেও এখন অনেক জায়গা প্লাস্টিকে ভরে থাকায় আগের মতো গাছ জন্মায় না।

তিনি বলেন, তাঁরা নিজেরা প্লাস্টিক না ফেলার চেষ্টা করেন। তবে ঘাট বা নৌযানে ডাস্টবিন না থাকায় ব্যবহৃত পানির বোতল কিংবা খাবারের প্যাকেট রাখারও নির্দিষ্ট জায়গা নেই। অনেক সময় এসব বর্জ্য নৌকায় করে লোকালয়ে এনে মাটিতে পুঁতে ফেলেন বলে জানান তিনি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, প্লাস্টিক দূষণের কারণে সুন্দরবনের গাছপালা, জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানত তিনটি উৎস থেকে সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ হচ্ছে; আপস্ট্রিম সোর্স, জেলে ও পর্যটক এবং অননুমোদিত চলাচল। আপস্ট্রিম নদীগুলো থেকে প্লাস্টিকের প্রবাহ কমানো গেলে দূষণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, প্লাস্টিক দূষণের কারণে সামুদ্রিক প্রাণী, বনজ বাস্তুতন্ত্র ও গাছপালার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বীজের অঙ্কুরোদগমের হারও কমে যায়। তাঁর গবেষণাতেও এসব প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তাঁর ভাষ্য, যেকোনোভাবে প্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে তা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। গণসচেতনতা ছাড়া প্লাস্টিকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়।

সুন্দরবনের পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্লাস্টিক দূষণের জন্য শুধু পর্যটকদের দায়ী করলে সমস্যার বড় একটি অংশ অমীমাংসিত থেকে যাবে। উপকূলীয় এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও ব্যবসায়ীদেরও সচেতন করতে হবে।

টোয়াসের সহসভাপতি মাঝহারুল হক কচি বলেন, তাঁরাও সুন্দরবনকে নিরাপদ রাখতে চান, কারণ তাঁদের ব্যবসাও এই বনের ওপর নির্ভরশীল। নিজেদের উদ্যোগে নদী পরিষ্কার অভিযান চালানোর পাশাপাশি পর্যটকদের সচেতন করার চেষ্টা করেন তাঁরা। তবে সরকার ও বন বিভাগের অংশগ্রহণ ছাড়া বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ করলেই হবে না, জাহাজে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে পর্যটকদের কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। মৌসুমের শুরু ও শেষে দুই দফায় টোয়াসের সদস্যরা প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহ করে খুলনায় নিয়ে ডাম্পিং করেন। এবার বর্জ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়ে এ কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবার ভ্রমণের সময় সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে জাহাজ থেকেও বর্জ্য অপসারণ করবেন বলে জানান তিনি।

বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক বহন করে নেওয়া কিংবা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বন প্রহরীরা নিয়মিত টহল ও তল্লাশি চালালেও নদীপথে ভেসে আসা বর্জ্য ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক নেওয়া বা ফেলা নিষিদ্ধ। বন প্রহরীরা নিয়মিত টহল দিয়ে পর্যটক ও জেলেদের তল্লাশি করেন। এরপরও নদীপথে ভেসে আসা প্লাস্টিক সুন্দরবনের নদী-খালে পৌঁছে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এই সমস্যা শুধু বন বিভাগ বা টোয়াসের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিতভাবে সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। বন বিভাগ বছরে কয়েকবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পাশাপাশি স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক সভা করে। তবে এই দূষণ ঠেকাতে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা।

সূত্র: ডেইলি স্টার