ঢাকা ০১:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা হিজড়া সম্প্রদায়ের

রীতা ভৌমিক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:০১:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
  • / 131

ফটো তুলেছেন রনি বাউল

হিজড়া অর্থাৎ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে বুলবুলি, হ্যাপী মনি (পারুতি) ও সাথী ইসলামের মতো কয়েকজন। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে চান।

বাংলাদেশের প্রথম হিজড়া বুলবুলি ডাইভিং লাইসেন্স পেয়ে চাকরির প্রত্যাশায় দিন গুণছেন। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েও তার চাকরি হচ্ছে না।

সাবেক বাংলাদেশ টুরিস্ট পুলিশের প্রধান (অতিরিক্ত আইজি) হাবিবুর রহমান ও মিরপুরের শহীদ স্মৃতি কলেজের গণিতের সহকারী অধ্যাপক বদরুজ্জামান ২০২১ সালে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কয়েকজন হিজড়াকে ড্রাইভিং এর প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেন।

ড্রাইভিং আসনে বুলবুলি, ছবি তুলেছেন রনি বাউল

বৃলবুলি বান্ধবীর কাছে প্রথম জানতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশ টুরিস্ট পুলিশের প্রধান ( অতিরিক্ত আইজি ) হাবিবুর রহমান শিক্ষিত, ভদ্র কয়েকজন হিজড়াকে ড্রাইভিং শেখাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এইচএসসি পরীক্ষা পর বাড়িতেই বসেছিলেন তিনি। বান্ধবী তাকে বললেন, তুমি যদি ড্রাইভিং শিখতে আগ্রহী হও তাহলে ঢাকায় আসো। বান্ধবীর ডাকে নড়াইল থেকে ঢাকায় ড্রাইভিং শিখতে চলে আসেন বুলবুলি।

বুলবুলির মতে, সাবেক অতিরিক্ত আইজি স্যারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, সব দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের সহকারী অধ্যাপক কাজী বদরুজ্জামানকে। বদরুজ্জামান স্যারের সাথে দেখা করি।

বদরুজ্জামান স্যার নিজের অর্থায়নে ১০ থেকে ১১ হিজড়াকে থাকা-খাওয়া, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ফি, যাতায়াত ভাড়াসহ সার্বিক ব্যবস্থা করেন। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে অংশ নিতে বেশির ভাগ হিজড়ারা আমাকে উৎসাহিত করেছেন। কয়েকজন আবার হতাশাজনক কথাবার্তাও বলেছেন।

তারা বলেছেন, তোমরা যে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছো, এটা করতে না পারলে লোকের কাছে আমাদের নিন্দা-মন্দ শুনতে হবে। ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ না বলেই কাজ করে খাওয়ার জন্য ড্রাইভিং শিখেছি।

গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণে গাড়ির পার্টস-কলাকৌশল, অর্ধেক পথ যাবার পর রাস্তায় গাড়ি নষ্ট হলে তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নিতে হবে, তেল থেকে গ্যাস, গ্যাস থেকে তেলে নিতে হয় ই্ত্যাদি বিষয়গুলো হাতেকলমে শিখিয়েছেন আমার ওস্তাদ।

প্রায় দুই বছর ধরে লাইসেন্স পেলেও কোনো চাকরি হয়নি। মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের একটাই আবেদন, তিনি যেন হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি প্রদানের উদ্যোগ নেন।

হিজড়াদের মধ্যে প্রথম গাড়ি চালক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেনো আমার বিষয়টি ভাবেন। পরিশ্রম করে উপার্জন না করে বাঁচতে চান। মানুষের কাছে হাত পেতে চেয়ে খাওয়া অমর্যাদা, ঘৃণিত কাজ বলে মনে করেন বুলবুলি। তাকে দেখে যাতে হাজারো হিজড়া নিজেকে পরিবর্তন করে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত হয় এই প্রত্যাশাই করেন তিনি।

কাজী বদরুজ্জামান এর মতে, অতিরিক্ত আইজি হাবিবুর রহমানকে বলেছিলাম, স্যার আমাকে একটা ভালো কাজ দিন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তৃতীয় লিঙ্গের কয়েকজনকে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রশিক্ষণ দিয়ে দিন। আমি সম্মতি জানাতেই তিনি ফোনে ১৬ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে ডেকে পাঠালেন।

তিনি তাদের বললেন, তোমাদের জন্য একটা করে শাড়ি নিয়ে এসেছি। ওদেরকে শাড়ি উপহার দিয়ে কারা ড্রাইভিং শিখতে চায় জানতে চান। রাখী নামে তৃতীয় লিঙ্গের একজন এসেছিলেন, ও বলে স্যার আমি শিখবো। আরো কয়েকজন শেখার আগ্রহ দেখায়। স্যার ওদের বলে দিলেন, আমার তত্ত্বাবধানে থেকে ওরা গাড়ি চালানো শিখবে।

তিনি আরো বলেন, ওদের জন্য প্রশিক্ষক ঠিক করা হয়। দুই মাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর রাখী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বন্ধ করে দেয়। বুলবুলি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে। এখন ৭ জনের মতো ড্রাইভিং শিখছে। হ্যাপী মনি (পারুতি) আর সাথী ইসলাম এখনো প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

যারা চলে গেছেন তারা বলছে, বুলবুলির লাইসেন্স পেয়েও চাকরি হচ্ছে না। ওর চাকরি হলে আমরা আবার প্রশিক্ষণে ফিরব। আমার স্ত্রী ভিকারুণনিসা স্কুলের শিক্ষক। আমাদের এক মেয়ে। আমরা স্বামী-স্ত্রী প্রতি মাসে কিছু টাকা ওদের প্রশিক্ষণ-থাকা-খাওয়ার জন্য ব্যয় করি। ভর্তি ফি একবারে প্রতিজন সাত হাজার টাকা নিলেও প্রশিক্ষক আমার কাছ থেকে নেন ৫ হাজার টাকা। প্রশিক্ষকও তাদের ড্রাইভিং শেখাতে কম ফি নিয়ে সহযোগিতা করছেন।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি হাবিবুর রহমান জানান, হিজড়া হলেও ওরা ভালো পরিবারের সন্তান। পৃথিবীর সকল মানুষই সমান। আমাদের সমাজে যে কুসংস্কার রয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে পিছিয়ে পড়া সকল মানুষের কথা ভেবে তাদের নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। তাদের মধ্যে হিজড়া, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষও রয়েছেন। সবাইকে নিয়েই সরকার এগিয়ে যেতে চায়।

তিনি বলেন, বুলবুলি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে। ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষা দিচ্ছে। ও যাতে একটা চাকরি পায় চেষ্টা করবো।
বুলবুলি নড়াইল আব্দুল হাই সিটি কলেজের বিএ’র শিক্ষার্থী। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। জন্মের পর থেকেই বাবা-মা বুঝতে পারেন তাদের সন্তান তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

একটু বড় হতেই ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী তারাও বুঝে যায় বুলবুলি তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখে বুলবুলি বুঝতে পারেন তিনি অন্য আর দশটা মানুষের মতো মেয়ে বা ছেলে নয়। ছেলেদের পোশাক পরলেও শারীরিক গঠন মেয়েদের মতো, তিনি তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। নিজের শরীরকে গোপন করার জন্য পুরুষের পোশাক পরে ছেলে পরিচয় দিতেন সমাজের অবহেলার কারণে।

বুলবুলি বলেন, বাবা-মা কখনো অবহেলা করেননি। শিক্ষকরা জানতেন, আমি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তারাও কখনো আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি। বরং সবরকমের সহযোগিতা করেছেন।

হ্যাপী মনি (পারুতি) বরিশালের ভোলার ভেড়ুইরা থেকে ঢাকা আসেন। তৃতীয় শ্রেনির পর লেখাপড়া আর হয়ে ওঠেনি। গুরু বুলবুলি তাকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে নিয়ে আসেন। সাথী ইসলাম সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার নবগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন ।

উল্লাপাড়া ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৬ সালে এইচএসসি পাশ করেন। তিনিও ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
তাদের সবাই স্বপ্ন দেখছেন, ভিক্ষাবৃত্তি করে নয়, কাজের মধ্য দিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করবেন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা হিজড়া সম্প্রদায়ের

সর্বশেষ আপডেট ০৯:০১:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

হিজড়া অর্থাৎ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে বুলবুলি, হ্যাপী মনি (পারুতি) ও সাথী ইসলামের মতো কয়েকজন। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে চান।

বাংলাদেশের প্রথম হিজড়া বুলবুলি ডাইভিং লাইসেন্স পেয়ে চাকরির প্রত্যাশায় দিন গুণছেন। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েও তার চাকরি হচ্ছে না।

সাবেক বাংলাদেশ টুরিস্ট পুলিশের প্রধান (অতিরিক্ত আইজি) হাবিবুর রহমান ও মিরপুরের শহীদ স্মৃতি কলেজের গণিতের সহকারী অধ্যাপক বদরুজ্জামান ২০২১ সালে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কয়েকজন হিজড়াকে ড্রাইভিং এর প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেন।

ড্রাইভিং আসনে বুলবুলি, ছবি তুলেছেন রনি বাউল

বৃলবুলি বান্ধবীর কাছে প্রথম জানতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশ টুরিস্ট পুলিশের প্রধান ( অতিরিক্ত আইজি ) হাবিবুর রহমান শিক্ষিত, ভদ্র কয়েকজন হিজড়াকে ড্রাইভিং শেখাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এইচএসসি পরীক্ষা পর বাড়িতেই বসেছিলেন তিনি। বান্ধবী তাকে বললেন, তুমি যদি ড্রাইভিং শিখতে আগ্রহী হও তাহলে ঢাকায় আসো। বান্ধবীর ডাকে নড়াইল থেকে ঢাকায় ড্রাইভিং শিখতে চলে আসেন বুলবুলি।

বুলবুলির মতে, সাবেক অতিরিক্ত আইজি স্যারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, সব দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের সহকারী অধ্যাপক কাজী বদরুজ্জামানকে। বদরুজ্জামান স্যারের সাথে দেখা করি।

বদরুজ্জামান স্যার নিজের অর্থায়নে ১০ থেকে ১১ হিজড়াকে থাকা-খাওয়া, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ফি, যাতায়াত ভাড়াসহ সার্বিক ব্যবস্থা করেন। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে অংশ নিতে বেশির ভাগ হিজড়ারা আমাকে উৎসাহিত করেছেন। কয়েকজন আবার হতাশাজনক কথাবার্তাও বলেছেন।

তারা বলেছেন, তোমরা যে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছো, এটা করতে না পারলে লোকের কাছে আমাদের নিন্দা-মন্দ শুনতে হবে। ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ না বলেই কাজ করে খাওয়ার জন্য ড্রাইভিং শিখেছি।

গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণে গাড়ির পার্টস-কলাকৌশল, অর্ধেক পথ যাবার পর রাস্তায় গাড়ি নষ্ট হলে তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নিতে হবে, তেল থেকে গ্যাস, গ্যাস থেকে তেলে নিতে হয় ই্ত্যাদি বিষয়গুলো হাতেকলমে শিখিয়েছেন আমার ওস্তাদ।

প্রায় দুই বছর ধরে লাইসেন্স পেলেও কোনো চাকরি হয়নি। মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের একটাই আবেদন, তিনি যেন হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি প্রদানের উদ্যোগ নেন।

হিজড়াদের মধ্যে প্রথম গাড়ি চালক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেনো আমার বিষয়টি ভাবেন। পরিশ্রম করে উপার্জন না করে বাঁচতে চান। মানুষের কাছে হাত পেতে চেয়ে খাওয়া অমর্যাদা, ঘৃণিত কাজ বলে মনে করেন বুলবুলি। তাকে দেখে যাতে হাজারো হিজড়া নিজেকে পরিবর্তন করে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত হয় এই প্রত্যাশাই করেন তিনি।

কাজী বদরুজ্জামান এর মতে, অতিরিক্ত আইজি হাবিবুর রহমানকে বলেছিলাম, স্যার আমাকে একটা ভালো কাজ দিন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তৃতীয় লিঙ্গের কয়েকজনকে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রশিক্ষণ দিয়ে দিন। আমি সম্মতি জানাতেই তিনি ফোনে ১৬ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে ডেকে পাঠালেন।

তিনি তাদের বললেন, তোমাদের জন্য একটা করে শাড়ি নিয়ে এসেছি। ওদেরকে শাড়ি উপহার দিয়ে কারা ড্রাইভিং শিখতে চায় জানতে চান। রাখী নামে তৃতীয় লিঙ্গের একজন এসেছিলেন, ও বলে স্যার আমি শিখবো। আরো কয়েকজন শেখার আগ্রহ দেখায়। স্যার ওদের বলে দিলেন, আমার তত্ত্বাবধানে থেকে ওরা গাড়ি চালানো শিখবে।

তিনি আরো বলেন, ওদের জন্য প্রশিক্ষক ঠিক করা হয়। দুই মাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর রাখী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বন্ধ করে দেয়। বুলবুলি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে। এখন ৭ জনের মতো ড্রাইভিং শিখছে। হ্যাপী মনি (পারুতি) আর সাথী ইসলাম এখনো প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

যারা চলে গেছেন তারা বলছে, বুলবুলির লাইসেন্স পেয়েও চাকরি হচ্ছে না। ওর চাকরি হলে আমরা আবার প্রশিক্ষণে ফিরব। আমার স্ত্রী ভিকারুণনিসা স্কুলের শিক্ষক। আমাদের এক মেয়ে। আমরা স্বামী-স্ত্রী প্রতি মাসে কিছু টাকা ওদের প্রশিক্ষণ-থাকা-খাওয়ার জন্য ব্যয় করি। ভর্তি ফি একবারে প্রতিজন সাত হাজার টাকা নিলেও প্রশিক্ষক আমার কাছ থেকে নেন ৫ হাজার টাকা। প্রশিক্ষকও তাদের ড্রাইভিং শেখাতে কম ফি নিয়ে সহযোগিতা করছেন।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি হাবিবুর রহমান জানান, হিজড়া হলেও ওরা ভালো পরিবারের সন্তান। পৃথিবীর সকল মানুষই সমান। আমাদের সমাজে যে কুসংস্কার রয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে পিছিয়ে পড়া সকল মানুষের কথা ভেবে তাদের নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। তাদের মধ্যে হিজড়া, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষও রয়েছেন। সবাইকে নিয়েই সরকার এগিয়ে যেতে চায়।

তিনি বলেন, বুলবুলি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে। ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষা দিচ্ছে। ও যাতে একটা চাকরি পায় চেষ্টা করবো।
বুলবুলি নড়াইল আব্দুল হাই সিটি কলেজের বিএ’র শিক্ষার্থী। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। জন্মের পর থেকেই বাবা-মা বুঝতে পারেন তাদের সন্তান তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

একটু বড় হতেই ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী তারাও বুঝে যায় বুলবুলি তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখে বুলবুলি বুঝতে পারেন তিনি অন্য আর দশটা মানুষের মতো মেয়ে বা ছেলে নয়। ছেলেদের পোশাক পরলেও শারীরিক গঠন মেয়েদের মতো, তিনি তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। নিজের শরীরকে গোপন করার জন্য পুরুষের পোশাক পরে ছেলে পরিচয় দিতেন সমাজের অবহেলার কারণে।

বুলবুলি বলেন, বাবা-মা কখনো অবহেলা করেননি। শিক্ষকরা জানতেন, আমি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তারাও কখনো আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি। বরং সবরকমের সহযোগিতা করেছেন।

হ্যাপী মনি (পারুতি) বরিশালের ভোলার ভেড়ুইরা থেকে ঢাকা আসেন। তৃতীয় শ্রেনির পর লেখাপড়া আর হয়ে ওঠেনি। গুরু বুলবুলি তাকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে নিয়ে আসেন। সাথী ইসলাম সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার নবগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন ।

উল্লাপাড়া ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৬ সালে এইচএসসি পাশ করেন। তিনিও ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
তাদের সবাই স্বপ্ন দেখছেন, ভিক্ষাবৃত্তি করে নয়, কাজের মধ্য দিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করবেন।