চলমান বিশ্বকাপকে ‘নৈরাশ্যের উৎসব’ বললেন করবিন
- সর্বশেষ আপডেট ০২:৪২:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
- / 59
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে চলমান ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-কে ‘ট্রাম্পীয় বিশ্বকাপ’ এবং ‘বর্ণবাদ ও নৈরাশ্যের উৎসব’ বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য (এমপি) জেরেমি করবিন। ইউর পার্টির এই সংসদীয় নেতা এবং সাবেক লেবার পার্টি প্রধান (২০১৫-২০২০) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত তাঁর একটি বিশেষ কলাম বা নিবন্ধে এই বিস্ফোরক মন্তব্য ও কঠোর সমালোচনা করেছেন। একই সাথে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, যারা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় মানবাধিকার নিয়ে চারদিক কাঁপিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, তারা এখন আমেরিকার এমন বৈষম্যমূলক আচরণের সামনে সম্পূর্ণ নীরব কেন?
জেরেমি করবিন তাঁর নিবন্ধে বেশ কিছু গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বৈষম্যের উদাহরণ টেনে এনেছেন। তাঁর মধ্যে অন্যতম হলো ওমর আরতানের ঘটনা। সোমালিয়ার এই নাগরিক ২০১৮ সাল থেকে ফিফা-স্বীকৃত একজন দক্ষ রেফারি, যিনি ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে ম্যাচ পরিচালনা করেছেন এবং ২০২৫ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের বর্ষসেরা পুরুষ রেফারি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বেও তিনি রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল, যা হতো কোনো সোমালি রেফারির জন্য প্রথম ইতিহাস। কিন্তু গত সপ্তাহান্তে মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না দিয়ে আটকে দেওয়া হয়।
মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার কোনো স্পষ্ট কারণ না জানালেও করবিন মনে করিয়ে দেন, সোমালিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা দেশগুলোর একটি। বিশ্বজুড়ে এই নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে মার্কিন প্রশাসনের একটি অজ্ঞাত সূত্র দাবি করে যে আরতানের নাকি ‘সম্ভাব্য সন্ত্রাসী’-যোগসূত্র রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে ওয়াশিংটনের এমন দাবিকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছেন করবিন। তিনি সরাসরি একে ‘বর্ণবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন।
করবিনের মতে, এই লজ্জাজনক ঘটনাটি আসলে আমেরিকার বিশাল সংকটের একটি ছোট অংশ মাত্র। বর্তমানে সোমালিয়া, লাওস, সিয়েরা লিওন, বুরকিনা ফাসো, মালি, নাইজার এবং দক্ষিণ সুদানসহ বিশ্বের মোট ৩৯টি দেশের ওপর মার্কিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। এর ফলে এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর এক-চতুর্থাংশের চেয়েও বেশি দেশের সাধারণ ফুটবল সমর্থকেরা কেবল মার্কিন ভিসার গ্যাঁড়াকলে পড়ে বৈষম্য ও বাধার মুখে পড়ছেন। অথচ ফিফা মুখে স্লোগান দেয় ‘ফুটবল বিশ্বকে এক করে’, কিন্তু বাস্তবে এবারের বিশ্বকাপ মানুষকে একত্রিত করার বদলে উল্টো চরমভাবে বিভক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই টুর্নামেন্ট শুরুর অনেক আগে থেকেই খেলোয়াড়, ম্যাচ কর্মকর্তা ও সমর্থকদের মানবাধিকার সংকট নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল। ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নির্যাতনমূলক, বৈষম্যমূলক এবং প্রাণঘাতী অভিবাসন প্রয়োগ ও গণ-আটকের ব্যবস্থা’।
নিবন্ধে করবিন তথ্য দেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই)-এর এক কর্মকর্তার গুলিতে রেনি গুড নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর আইসিইর হেফাজতে থাকা অবস্থায় অ্যালেক্স প্রেট্টি নামের আরেকজন প্রাণ হারান। শুধু এই বছরই আইসিইর হেফাজতে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত জুন মাসে মার্কিন প্রশাসন প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি বৈধ অভিবাসীকে দেশ থেকে বহিষ্কার বা ডিপোর্ট করার উদ্যোগ নিয়েছিল—যা মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনাল ম্যাচের মোট দর্শকসংখ্যার চেয়েও ছয় গুণেরও বেশি। অথচ আইসিইর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ঘোষণা দিয়েছেন, বিশ্বকাপের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে তাদের এই বিতর্কিত সংস্থাটি। এখন পর্যন্ত ফিফা বা মার্কিন প্রশাসন কেউই নিশ্চিত করতে পারেনি যে, মাঠে আসা বিদেশি সমর্থকেরা আইসিই-র বেআইনি আটক, হুটহাট অভিযান বা বহিষ্কারের ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবেন কি না। এর পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা, গৃহহীন মানুষদের উচ্ছেদ, ব্যাপক নজরদারি এবং এলজিবিটিকিউ প্লাস সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে অ্যামনেস্টি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
করবিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চার বছর আগে কাতারে যখন বিশ্বকাপ হয়েছিল, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শ্রমিক শোষণ ও সমকামীদের অধিকার নিয়ে খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীসহ পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা যেভাবে সরব হয়েছিলেন, আজ আমেরিকার ক্ষেত্রে তাদের এই ‘বধির করে দেওয়ার মতো নীরবতা’ সত্যিই এক চরম দ্বৈত মানদণ্ড ও ভণ্ডামি।
সাবেক এই লেবার নেতা আরও গুরুতর অভিযোগ তোলেন যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন প্রতিষ্ঠিত ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দেওয়ার পর থেকে মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অবৈধভাবে অপহরণ করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং কিউবার ওপর তাদের অপরাধমূলক অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কঠোর করেছে। আর এই তিনটি অপরাধেরই নীরব অংশীদার যুক্তরাজ্য বা ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটিশ সরকার ট্রাম্পের এই রাষ্ট্রীয় গুন্ডামির কোনো প্রতিবাদ তো করেইনি, উল্টো ইরানে বিমান হামলার জন্য আমেরিকার সামরিক বাহিনীকে নিজেদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে এবং সংকটের সময়ে কিউবার পাশে দাঁড়ায়নি। এর সাথে গাজায় ইসরায়েলের বর্বরোচিত গণহত্যায় মার্কিন ও ব্রিটিশদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ওমর আরতানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রী লিজ কেন্ডালের ‘আমি আমেরিকার অভিবাসন নীতির জন্য দায়ী নই’—এমন দায়সারা মন্তব্যের জবাবে করবিন বলেন, এটি হয়তো সত্য, কিন্তু এটাও সমান সত্য যে আমেরিকার এই প্রকাশ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের পেছনে আমাদের মতো পশ্চিমা সরকারগুলোর স্বস্তিদায়ক ও ভীরু নীরবতাই সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
সবশেষে করবিন বলেন, ‘আমি ফুটবলকে মনে-প্রাণে ভালোবাসি। কিন্তু ফুটবল শেষ পর্যন্ত একটা খেলা মাত্র; মানুষের অমূল্য জীবন ও অধিকার তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। তাই এখন সময় এসেছে বিশ্বনেতাদের তুষ্টিকরণ, ভীরুতা ও ভণ্ডামির নীতি পরিহার করে পৃথিবীর সব মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় মাঠে নেমে কঠোর অবস্থান নেওয়ার।



































