ঢাকা ০২:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর দেখা হবে না, সৌদি থেকে শেষ বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:১৩:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / 201

আর দেখা হবে না, সৌদি থেকে শেষ বার্তা

কারখানার ভেতরে তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। চারদিকে ধোঁয়া আর আতঙ্ক। বের হওয়ার পথও বন্ধ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন দুই ভাই মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক। ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক ফোন দেওয়ার চেষ্টা করলেও বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল না। ফলে সন্তানদের শেষ ফোনটি আর পৌঁছায়নি বাবা-মায়ের কাছে।

পরে ভয়েস মেসেজে নিজেদের শেষ অবস্থার কথা জানান দুই ভাই। সেখানে তারা বলেন, ‘কারখানায় আগুন ধরেছে। দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছি না। হয়তো আমরা মারা যাব। আমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’

এরপর আর কোনো ফোন আসেনি। ওই ভয়েস মেসেজই হয়ে থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দুই ভাইয়ের শেষ যোগাযোগ।

নিহত মোহন ও সুমন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে। রোববার সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই সহোদরসহ অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন রয়েছেন।

দুই ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা গোফ্ফার প্রামাণিক। সন্তানদের মৃত্যুর শোকের সঙ্গে যোগ হয়েছে তাদের সঙ্গে শেষবার কথা বলতে না পারার কষ্ট। তিনি জানান, তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি নিজে এবং ছোট ছেলে মামুন হোসেন (১৭) শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের নিজস্ব জমিজমাও নেই।

অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় আট বছর আগে ধারদেনা করে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি আরবে পাঠান গোফ্ফার। প্রবাসে গিয়ে কাজ শুরু করার পর কয়েক বছরের মধ্যেই পরিবারের ঋণ শোধ করেন মোহন। এরপর প্রায় দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও সৌদি আরবে পাঠানো হয়। দুই ভাই একই কারখানায় কাজ করতেন।

প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে টাকা জমিয়ে দেশে একটি পাকা বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল দুই ভাইয়ের। বাড়ি করার পর একসঙ্গে দেশে ফিরে বিয়ে করে সংসার পাতার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছিল। গত বুধবার বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণের জন্য ভিত্তি স্থাপন করা হয়। নির্মাণকাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানেই সেই বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া।

রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের ওই সোফা কারখানায় আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। কারখানার ভেতরে থাকা অনেক শ্রমিক বের হতে পারেননি। পরে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

সন্তানদের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন গোফ্ফার প্রামাণিক। তিনি বলেন, আগুন লাগার পর দুই ছেলে বারবার ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখন বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট সংযোগও ছিল না। ফলে তাদের সঙ্গে শেষবার কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, পরে ছেলেরা ভয়েস মেসেজ পাঠায়। সেখানে তারা জানায়, কারখানায় আগুন লেগেছে এবং দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছে না। হয়তো তারা আর বাঁচবে না। বাবা-মায়ের সঙ্গে আর দেখা হবে না; এমন আশঙ্কার কথাও জানিয়ে তাদের জন্য দোয়া করতে বলে তারা।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, আত্রাই উপজেলার নিহত ১৩ জন হলেন—পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল, ডুবাই গ্রামের বাদলের ছেলে মো. সুমন হোসেন, একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে মো. হাসিবুল হাসান শুভ, গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে মো. মোহন প্রামাণিক ও মো. সুমন প্রামাণিক, একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে মো. রুবেল হোসেন, ফজলুর ছেলে মো. কলিউদ্দিন প্রামাণিক, সাধনগর গ্রামের মো. সাগর হোসেন, উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে মো. ফরিদ শেখ, মাদবপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মো. মজিদুল ইসলাম, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা, মধ্যেবোয়ালিয়া গ্রামের মো. মিনহাজ এবং খরসতী গ্রামের মো. মহিদুল ইসলাম।

নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশেষ করে গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের বাড়িতে চলছে আহাজারি। কয়েক দিন আগেও যে বাড়িতে দুই ছেলের স্বপ্নের নতুন ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল, এখন সেখানেই অপেক্ষা তাদের মরদেহের।

স্বজনদের দাবি, দ্রুত নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আর দেখা হবে না, সৌদি থেকে শেষ বার্তা

সর্বশেষ আপডেট ০৪:১৩:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

কারখানার ভেতরে তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। চারদিকে ধোঁয়া আর আতঙ্ক। বের হওয়ার পথও বন্ধ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন দুই ভাই মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক। ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক ফোন দেওয়ার চেষ্টা করলেও বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল না। ফলে সন্তানদের শেষ ফোনটি আর পৌঁছায়নি বাবা-মায়ের কাছে।

পরে ভয়েস মেসেজে নিজেদের শেষ অবস্থার কথা জানান দুই ভাই। সেখানে তারা বলেন, ‘কারখানায় আগুন ধরেছে। দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছি না। হয়তো আমরা মারা যাব। আমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’

এরপর আর কোনো ফোন আসেনি। ওই ভয়েস মেসেজই হয়ে থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দুই ভাইয়ের শেষ যোগাযোগ।

নিহত মোহন ও সুমন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে। রোববার সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই সহোদরসহ অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন রয়েছেন।

দুই ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা গোফ্ফার প্রামাণিক। সন্তানদের মৃত্যুর শোকের সঙ্গে যোগ হয়েছে তাদের সঙ্গে শেষবার কথা বলতে না পারার কষ্ট। তিনি জানান, তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি নিজে এবং ছোট ছেলে মামুন হোসেন (১৭) শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের নিজস্ব জমিজমাও নেই।

অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় আট বছর আগে ধারদেনা করে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি আরবে পাঠান গোফ্ফার। প্রবাসে গিয়ে কাজ শুরু করার পর কয়েক বছরের মধ্যেই পরিবারের ঋণ শোধ করেন মোহন। এরপর প্রায় দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও সৌদি আরবে পাঠানো হয়। দুই ভাই একই কারখানায় কাজ করতেন।

প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে টাকা জমিয়ে দেশে একটি পাকা বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল দুই ভাইয়ের। বাড়ি করার পর একসঙ্গে দেশে ফিরে বিয়ে করে সংসার পাতার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছিল। গত বুধবার বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণের জন্য ভিত্তি স্থাপন করা হয়। নির্মাণকাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানেই সেই বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া।

রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের ওই সোফা কারখানায় আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। কারখানার ভেতরে থাকা অনেক শ্রমিক বের হতে পারেননি। পরে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

সন্তানদের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন গোফ্ফার প্রামাণিক। তিনি বলেন, আগুন লাগার পর দুই ছেলে বারবার ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখন বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট সংযোগও ছিল না। ফলে তাদের সঙ্গে শেষবার কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, পরে ছেলেরা ভয়েস মেসেজ পাঠায়। সেখানে তারা জানায়, কারখানায় আগুন লেগেছে এবং দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছে না। হয়তো তারা আর বাঁচবে না। বাবা-মায়ের সঙ্গে আর দেখা হবে না; এমন আশঙ্কার কথাও জানিয়ে তাদের জন্য দোয়া করতে বলে তারা।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, আত্রাই উপজেলার নিহত ১৩ জন হলেন—পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল, ডুবাই গ্রামের বাদলের ছেলে মো. সুমন হোসেন, একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে মো. হাসিবুল হাসান শুভ, গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে মো. মোহন প্রামাণিক ও মো. সুমন প্রামাণিক, একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে মো. রুবেল হোসেন, ফজলুর ছেলে মো. কলিউদ্দিন প্রামাণিক, সাধনগর গ্রামের মো. সাগর হোসেন, উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে মো. ফরিদ শেখ, মাদবপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মো. মজিদুল ইসলাম, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা, মধ্যেবোয়ালিয়া গ্রামের মো. মিনহাজ এবং খরসতী গ্রামের মো. মহিদুল ইসলাম।

নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশেষ করে গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের বাড়িতে চলছে আহাজারি। কয়েক দিন আগেও যে বাড়িতে দুই ছেলের স্বপ্নের নতুন ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল, এখন সেখানেই অপেক্ষা তাদের মরদেহের।

স্বজনদের দাবি, দ্রুত নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।