অনলাইনে শিশু সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৮:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 83
অনলাইনে শিশুদের যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং, প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা ও ডিজিটাল অনিরাপত্তা প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন শিশু অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, অনলাইন কিংবা অফলাইনে যেকোনো ধরনের নির্যাতন, বিশেষ করে যৌন নির্যাতন ও শোষণের শিকার শিশুদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, পুনর্বাসন, মানসিক সুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত করতে কার্যকর কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মিরপুরে এসওএস ন্যাশনাল ট্রেনিং সেন্টারে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স আয়োজিত ‘খসড়া কেস ম্যানেজমেন্ট সহায়িকা’ চূড়ান্তকরণ কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আর্থিক সহযোগিতায় এবং টেরে দেস হোমস নেদারল্যান্ডসের কারিগরি সহায়তায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ইনসিডিন বাংলাদেশ ও ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের যৌথ উদ্যোগে কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা। কেস ম্যানেজমেন্টের খসড়া উপস্থাপন করেন ‘স্পিক আপ’ প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী নূর জামান এবং প্রকল্প কর্মকর্তা সাহাল উল ইসলাম। এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সমন্বয়কারী চৌধুরী মোহাম্মদ মোহাইমেন, মিরপুর সমাজসেবা কর্মকর্তা ইয়াসমিন সুলতানা, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা রাশিদা বেগম, পল্লবীর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফারজানা শারমিন, পল্লবী থানার এসআই নাইমা খাতুন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সচিব আবু সাঈদ পান্নাসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।
রোকসানা সুলতানা বলেন, অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ইনসিডিন বাংলাদেশ এবং ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স যৌথভাবে এই কেস ম্যানেজমেন্টের খসড়া প্রস্তুত করেছে। এটি সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি কার্যকর নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
নূর জামান বলেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই কেস ম্যানেজমেন্ট সহায়িকা তৈরি করা হয়েছে। এতে নিরাপদ অনলাইন ব্যবহারের পাশাপাশি শিশু অধিকার সুরক্ষা, সুশাসন, নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা, যুব উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রুমিং’ শব্দটি সাধারণ অর্থে ইতিবাচক হলেও সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে এটি শিশু-কিশোরদের বিশ্বাস অর্জন করে তাদের যৌন শোষণ বা অপরাধের ফাঁদে ফেলার কৌশল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তাই শিশু ও তরুণদের নিরাপদ অনলাইন পরিবেশে মতপ্রকাশ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রকল্প কর্মকর্তা সাহাল উল ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রজন্ম এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে বেড়ে উঠছে। ফেক আইডি, গ্রুমিং, হ্যাকিং, সাইবার প্রতারণাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলের মাধ্যমে শিশুরা যৌন নির্যাতন ও শোষণের শিকার হচ্ছে।
তার ভাষ্য, এসব ঘটনার ফলে শিশুদের মধ্যে ভয়, লজ্জা, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং মানসিক আঘাত তৈরি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব তাদের শিক্ষা, সামাজিক জীবন এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়িয়ে দেয়। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় শিশু ও অভিভাবক—উভয়ের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সমন্বয়কারী চৌধুরী মোহাম্মদ মোহাইমেন বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ১৯৮ ধরনের বিষয়ে সেবা দিয়ে থাকে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই জবাবদিহিতার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু, আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশু—এই তিন শ্রেণির প্রতিটি শিশুর জন্যই কেস ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একজন সমাজকর্মীকে কার্যকরভাবে সেবা দিতে হলে শিশুর ব্যক্তিগত সক্ষমতা, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে। এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই একটি সফল কেস ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত হয়।
তিনি জানান, শিশুদের সুরক্ষায় ‘চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮’ ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এক মেধাবী কিশোর ভিপিএন ব্যবহার করে মেয়ের পরিচয়ে এক কিশোরীর সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা করেছিল। পরে তাকে শনাক্ত করে পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ না করে কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা হয়। প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, যা সময়োপযোগী কাউন্সেলিং ও কেস ম্যানেজমেন্টের কার্যকারিতার একটি উদাহরণ।



































